সূচিপত্র
বাড়ির দেয়ালে ছোটবেলার আঁকা ছবিগুলো বাঁধিয়ে রাখা পরিবারও ভর্তির মৌসুমে বলে বসে, “আঁকাআঁকি তো শখ, পড়াশোনাটা সিরিয়াস কিছুতে কর।” অথচ যে দেশে ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন, অ্যাপের ইন্টারফেস, পত্রিকার পাতা আর ফেসবুকের প্রতিটা ক্যাম্পেইন কোনো না কোনো ডিজাইনারের হাত দিয়ে বেরোয়, সেখানে চারুকলা এখন শখের বিষয় না, চাহিদার বিষয়।
Subject Review সিরিজের এই কিস্তি, a complete fine arts subject review in Bangla: ঢাবির চ ইউনিটের ভর্তি থেকে শুরু করে ৮টা বিভাগের ভেতরের জগৎ, আর সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটার সৎ উত্তর — এই ডিগ্রিতে পেট চলে কি না।
চারুকলা রিভিউ: সংক্ষেপে
- পড়ার বিষয়: ড্রয়িং-পেইন্টিং থেকে গ্রাফিক ডিজাইন, ভাস্কর্য থেকে শিল্পকলার ইতিহাস — হাতে-কলমে স্টুডিওনির্ভর শিক্ষা
- প্রধান ঠিকানা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, ৮টা বিভাগ, সাম্প্রতিক সাইকেলে আসন ১৩০-এর মতো
- ভর্তি: চারুকলা (পুরোনো “চ”) ইউনিট — সাধারণ জ্ঞান MCQ + মুক্তহস্ত অঙ্কন, তিন শাখার শিক্ষার্থীই আবেদন করতে পারেন
- ক্যারিয়ার: গ্রাফিক-UX ডিজাইন, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, অ্যানিমেশন, ফ্রিল্যান্সিং, শিক্ষকতা, স্বাধীন শিল্পচর্চা
- বাস্তবতা: অঙ্কনের দক্ষতা ছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় টেকা অসম্ভব — প্রস্তুতিটা খাতা-কলমের, মুখস্থের না
“আঁকাআঁকি করে খাবে কী” — ভুল ধারণাটা আগে
হিসাবটা একবার উল্টো দিক থেকে করা যাক। দেশের প্রতিটা কোম্পানির লোগো, প্যাকেট, বিলবোর্ড, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট কারা বানায়? প্রতিটা নিউজপোর্টাল, টিভি চ্যানেল, ই-কমার্স সাইটের ভিজ্যুয়াল কারা সামলায়? বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্স আয়ের বড় একটা অংশ আসে কোন কাজ থেকে? তিনটারই উত্তরে ডিজাইনাররা আছেন, আর সেই ডিজাইনারদের সবচেয়ে শক্ত ভিতটা তৈরি হয় চারুকলার প্রশিক্ষণে — কম্পোজিশন, রং, ফর্ম আর চোখের সেই ট্রেনিং, যেটা শুধু সফটওয়্যার শিখে আসে না।
মানে “চারুকলা পড়ে কী হবে” প্রশ্নের আধুনিক উত্তর: ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রির যেকোনো দরজা। ক্যানভাসের শিল্পী হওয়ার পথটা তো আছেই, তবে সেটা এখন অনেকগুলো পথের একটা মাত্র।
ঢাবির চারুকলা: ৮টা বিভাগে কী শেখানো হয়

- অঙ্কন ও চিত্রায়ণ (Drawing & Painting): চারুকলার মেরুদণ্ড — ফিগার ড্রয়িং, কম্পোজিশন, রঙের ভাষা
- গ্রাফিক ডিজাইন: চাকরির বাজারের সবচেয়ে চাহিদার বিভাগ — টাইপোগ্রাফি, ব্র্যান্ডিং, ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন
- প্রিন্টমেকিং: ছাপচিত্রের শিল্প — উডকাট, এচিং, লিথোগ্রাফ
- প্রাচ্যকলা (Oriental Art): এই অঞ্চলের ধ্রুপদি ধারা — ওয়াশ টেকনিক, মিনিয়েচার
- মৃৎশিল্প (Ceramics): মাটি থেকে শিল্প — ফর্ম, গ্লেজ, স্টুডিও পটারি
- ভাস্কর্য (Sculpture): ত্রিমাত্রিক ফর্মের জগৎ
- কারুশিল্প (Crafts): ঐতিহ্যের নকশা থেকে আধুনিক প্রয়োগ — টেক্সটাইল ডিজাইনের সাথেও যোগ আছে
- শিল্পকলার ইতিহাস: তত্ত্ব-গবেষণার পথ — কিউরেটর, সমালোচক, গবেষক হওয়ার ভিত
পড়ার ধরনটাই আলাদা: লেকচারের চেয়ে স্টুডিও বেশি, পরীক্ষার খাতার চেয়ে সাবমিশন আর ডিসপ্লে বেশি। বছর শেষের প্রদর্শনী, বৈশাখের শোভাযাত্রার কাজ — শেখাটা এখানে হাতে হাতে।
ভর্তি: চ ইউনিটের পরীক্ষা যেমন হয়
ঢাবির চারুকলা ইউনিটে (পুরোনো নাম “চ” ইউনিট) তিন শাখার (বিজ্ঞান-ব্যবসায়-মানবিক) শিক্ষার্থীরাই আবেদন করতে পারেন — বিভাগ না, দক্ষতাই এখানে ছাঁকনি। সাম্প্রতিক সাইকেলের কাঠামো:
- সাধারণ জ্ঞান (MCQ): ৪০ নম্বর — শিল্পকলা-সংস্কৃতিসহ সাধারণ জ্ঞান
- অঙ্কন (মুক্তহস্ত): ৬০ নম্বর — চ ইউনিটের আসল পরীক্ষা; বস্তু-দৃশ্য-ফিগার আঁকার দক্ষতা
- GPA থেকে: ২০ নম্বর — SSC ও HSC-র ফলের ওজন (হিসাবটা বুঝতে জিপিএ ক্যালকুলেটর)
- আসন: সাম্প্রতিক সাইকেলে ১৩০-এর মতো — মানে প্রতিযোগিতা তীব্র, তবে প্রার্থীর পুলটাও আলাদা (সবাই আঁকিয়ে)
প্রস্তুতির সৎ কথা: MCQ অংশ দুই-তিন মাসের গোছানো পড়ায় সামলানো যায়, কিন্তু অঙ্কনের হাত এক মৌসুমে তৈরি হয় না। HSC-র এক-দুই বছর আগে থেকে নিয়মিত ড্রয়িং প্র্যাকটিস (প্রতিদিন, অবজারভেশন থেকে) — এটাই চ ইউনিটে টেকা মানুষদের কমন গল্প। মানবণ্টন-তারিখ বছরভেদে বদলায়, চূড়ান্ত তথ্য ঢাবির অফিসিয়াল সাইটে; ইউনিট-কাঠামোর পুরো ছবি আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিভিউতে।
ঢাবি ছাড়া আর কোথায় পড়া যায়
রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব চারুকলা অনুষদ/ইনস্টিটিউট আছে, খুলনাসহ আরও কয়েকটা পাবলিকেও চারুকলার বিভাগ চালু — ভর্তি সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ নিজ প্রক্রিয়ায়, প্রায় সবখানেই ব্যবহারিক (অঙ্কন) পরীক্ষাসহ। বেসরকারিতে শান্ত-মারিয়াম, ইউডার মতো প্রতিষ্ঠান ফাইন আর্টস-গ্রাফিক ডিজাইন পড়ায়; সেখানে ভর্তি সহজ, তবে খরচ আর মানের হিসাবটা প্রতিষ্ঠানভেদে যাচাই করে নেবেন। আর যাঁরা এখনো কলেজ-পর্যায়ে, বিভাগ বাছাইয়ের দ্বিধায় — সায়েন্স, কমার্স নাকি মানবিক লেখাটা পড়ুন; চারুকলার দরজা তিন শাখা থেকেই খোলা, তাই আঁকার চর্চাটাই আসল বিনিয়োগ।
ক্যারিয়ার: ক্যানভাস থেকে ক্লায়েন্ট পর্যন্ত

- গ্রাফিক ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিং: সবচেয়ে বড় নিয়োগক্ষেত্র — এজেন্সি, কর্পোরেট ইনহাউস টিম, মিডিয়া হাউস
- UX-UI ডিজাইন: টেক কোম্পানি-স্টার্টআপের চাহিদার শীর্ষে; চারুকলার ভিজ্যুয়াল ভিত + নিজে শেখা টুল (Figma-ঘরানার) = শক্তিশালী কম্বো
- বিজ্ঞাপন ও ক্রিয়েটিভ এজেন্সি: আর্ট ডিরেক্টর ট্র্যাক — জুনিয়র ডিজাইনার থেকে ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর পর্যন্ত সিঁড়ি
- অ্যানিমেশন, মোশন ও গেম আর্ট: ক্রমবর্ধমান স্টুডিও-বাজার, দেশে ও রিমোটে
- শিক্ষকতা ও গবেষণা: স্কুল-কলেজের চারু ও কারুকলা, বিশ্ববিদ্যালয়, আর শিল্পকলার ইতিহাস ধরে কিউরেটর-গবেষক পথ
- ফ্রিল্যান্স ও নিজের স্টুডিও: আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে ডলারে আয়ের বাস্তব পথ; সাথে প্রদর্শনী-কমিশনভিত্তিক শিল্পচর্চা
আয়ের সৎ চিত্র: শুরুর চাকরিতে অঙ্কটা মাঝারি — এজেন্সি-ইনহাউস পদে দেশের সাধারণ এন্ট্রি-লেভেল বেতনের কাছাকাছি। এই লাইনের আসল সম্পদ পোর্টফোলিও: কাজ যত জমে আর যত ভালো হয়, দর তত দ্রুত বাড়ে, আর ফ্রিল্যান্স-রিমোট বাজারে সেই পোর্টফোলিওই সীমানা ভেঙে দেয়। ডিগ্রি এখানে দরজা খোলে, পোর্টফোলিও ঘরটা কিনে দেয়।
কাদের জন্য চারুকলা, কাদের জন্য না
চারুকলা তাঁদের জন্য, যাঁদের আঁকা “ভালো লাগা” পেরিয়ে অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে — যাঁরা না এঁকে থাকতে পারেন না, সমালোচনা শুনে খাতা ছিঁড়ে ফেলার বদলে পরের ড্রয়িংটা ভালো করেন, আর ক্যারিয়ারটা নিজের হাতে (পোর্টফোলিও দিয়ে) গড়ার ধৈর্য রাখেন। সৃজনশীল কাজের স্বাধীনতা যাঁদের কাছে নিরাপত্তার চেয়ে দামি, এই অনুষদ তাঁদেরই।
আর যাঁরা নিশ্চিত মাসিক কাঠামো ছাড়া অস্থির বোধ করেন, ডেডলাইনের রাতজাগা সহ্য হয় না, বা আঁকাটা শুধু “অপশন না পেয়ে” — তাঁদের জন্য এটা কঠিন পথ হবে। মাঝামাঝি একটা সৎ পরামর্শ: ভর্তি প্রস্তুতির ছয় মাস প্রতিদিন আঁকুন; অভ্যাসটা আনন্দ দিলে এগোন, বোঝা লাগলে উত্তর পেয়ে গেছেন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
বিজ্ঞান বিভাগ থেকে কি চারুকলায় ভর্তি হওয়া যায়?
যায় — চ ইউনিট তিন শাখার জন্যই খোলা, GPA-র ন্যূনতম শর্ত পূরণ হলেই আবেদন চলে। মেধাতালিকা হয় পরীক্ষার (বিশেষত অঙ্কনের) পারফরম্যান্সে, HSC-র বিভাগ দেখে না।
আঁকা মোটামুটি পারি — কোচিং করলে কি চ ইউনিটে চান্স সম্ভব?
কোচিং কৌশল শেখাতে পারে (কম্পোজিশন, সময় ব্যবস্থাপনা, কমন সাবজেক্ট), কিন্তু হাতের দক্ষতা আসে শুধু চর্চায়। “মোটামুটি” থেকে “টেকার মতো” হতে সাধারণত মাসের পর মাস দৈনিক প্র্যাকটিস লাগে — যত আগে শুরু, তত ভালো।
চারুকলা পড়ে কি সরকারি চাকরি হয়?
হয় — স্কুল-কলেজের চারু ও কারুকলার শিক্ষক পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, শিল্পকলা একাডেমি-জাদুঘর-প্রত্নতত্ত্ব ঘরানার প্রতিষ্ঠান, আর বিসিএসের সাধারণ পথ তো সবার জন্যই খোলা।
গ্রাফিক ডিজাইন তো কোর্স করেই শেখা যায় — ৪ বছরের ডিগ্রি কেন?
টুল শেখা যায় কোর্সে, চোখ তৈরি হয় ট্রেনিংয়ে। ডিগ্রি দেয় ফর্ম-রং-কম্পোজিশনের গভীর ভিত, পোর্টফোলিও গড়ার চার বছর, শিক্ষক-সহপাঠীর নেটওয়ার্ক আর শিক্ষকতাসহ যেসব পথে সার্টিফিকেট লাগে সেই দরজাগুলো। দুটোর তুলনা আসলে হয় না — সিরিয়াস ক্যারিয়ারে দুটোই লাগে।
মেয়েদের জন্য চারুকলা কেমন?
চারুকলায় ছাত্রীদের উপস্থিতি বরাবরই শক্তিশালী, আর ডিজাইন-শিক্ষকতা-ফ্রিল্যান্সের মতো ক্ষেত্রগুলোতে কাজের ধরন ও সময়ের নমনীয়তা বাড়তি সুবিধা। পোর্টফোলিওনির্ভর বাজারে মূল্যায়নটাও কাজ দেখে, অন্য কিছু দেখে না।
রেজাল্টের পর প্রস্তুতি কীভাবে সাজাব?
রেজাল্ট দেখা আর ভর্তির টাইমলাইনটা আগে বুঝে নিন — পুরো গাইড HSC Result দেখার নিয়মে। তারপর দুই ভাগে প্রস্তুতি: প্রতিদিন অঙ্কন (অবজারভেশন ড্রয়িং সবার আগে), আর শিল্পকলা-সংস্কৃতির সাধারণ জ্ঞান। মানবিকের বাকি বিষয় ভাবনায় থাকলে ইংরেজি রিভিউটাও ঘুরে আসুন।

