সূচিপত্র
বাংলাদেশের ভর্তিযুদ্ধের সবচেয়ে আবেগমাখা নামটা সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কারও কাছে এটা পরিবারের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়-গ্র্যাজুয়েট হওয়ার স্বপ্ন, কারও কাছে টিএসসির আড্ডা আর কার্জন হলের সামনে একটা ছবি। প্রতি বছর কয়েক লাখ পরীক্ষার্থী লড়েন ছয় হাজারের কিছু বেশি আসনের জন্য, আর সেই লড়াইয়ের নিয়মকানুন প্রতি বছর একটু-আধটু বদলায়ও।
এই লেখাটা আমাদের University Review সিরিজের প্রথম কিস্তি, a complete Dhaka University review in Bangla: ইউনিট-আসন-মানবণ্টনের শুকনো তথ্য থেকে হল-জীবনের ভেজা বাস্তবতা, দুটোই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিভিউ: সংক্ষেপে
- প্রতিষ্ঠা: ১৯২১, দেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়, ডাকনাম “প্রাচ্যের অক্সফোর্ড”
- ভর্তি: ৫টা ইউনিট, মোট আসন ৬ হাজারের বেশি, পরীক্ষা MCQ + লিখিত
- যোগ্যতা: ইউনিটভেদে SSC+HSC মিলিয়ে GPA 7.50-8.00 (৪র্থ বিষয়সহ), প্রতি বছরের সার্কুলারই চূড়ান্ত
- বড় পরিবর্তন: পুরোনো ঘ (সমন্বিত) ইউনিট বিলুপ্ত, আর সাত কলেজ এখন ঢাবির অধীনে নেই
- শক্তি: ব্র্যান্ড, নেটওয়ার্ক, ঢাকার কেন্দ্রে ক্যাম্পাস, ক্লাব-সংগঠনের জগৎ
- দুর্বলতা: আবাসন সংকট, বড় ব্যাচ, বিভাগভেদে সুবিধার তারতম্য
এক নজরে শতবর্ষের ইতিহাস
১৯২১ সালে মাত্র ৩টা অনুষদ আর কয়েকশো শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু, তারপর এই ক্যাম্পাস দেশের ইতিহাসের প্রায় প্রতিটা বাঁকের সাক্ষী: ভাষা আন্দোলনের মিছিল বেরিয়েছে এখান থেকে, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহিদদের তালিকায় এই ক্যাম্পাসের নাম, গণআন্দোলনগুলোর কেন্দ্রও বারবার এই এলাকা। আজকের ঢাবি মানে কয়েক ডজন বিভাগ-ইনস্টিটিউট, চল্লিশ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী (সান্ধ্য-পেশাগত প্রোগ্রামসহ), আর কার্জন হল থেকে টিএসসি পর্যন্ত ছড়ানো একটা জীবন্ত ইতিহাস-বই। বিস্তারিত জানতে ঘুরে আসতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল সাইটে।
ইউনিট ও আসন: কোথায় কত সুযোগ
পুরোনো ক-খ-গ-ঘ নামগুলো মানুষের মুখে এখনো চালু, তবে কাঠামো বদলেছে: সমন্বিত ঘ ইউনিট বিলুপ্ত, এখন ভর্তি হয় মূলত চারটা ইউনিট আর IBA-র নিজস্ব পরীক্ষায়। সাম্প্রতিক (২০২৪-২৫) সাইকেলের আসন-চিত্র:
| ইউনিট | কাদের জন্য | আসন (প্রায়) |
|---|---|---|
| বিজ্ঞান ইউনিট (পুরোনো “ক”) | বিজ্ঞান বিভাগ | ১,৭৯৫ |
| কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিট (পুরোনো “খ”) | সব বিভাগ (শর্তসাপেক্ষে) | ২,৯৩৪ |
| ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিট (পুরোনো “গ”) | সব বিভাগ (শর্তসাপেক্ষে) | ১,৪৭৫ |
| চারুকলা ইউনিট (পুরোনো “চ”) | অঙ্কনে দক্ষ, সব বিভাগ | ১৩৫ |
| IBA (BBA প্রোগ্রাম) | নিজস্ব আলাদা পরীক্ষা | ১২০-এর ঘরে |

মেধাক্রম আর পছন্দের ভিত্তিতে বিভাগ বণ্টন হয়, ভালো অবস্থানে থাকলে সিএসই, আইন, IR, AIS, ফার্মেসির মতো চাহিদার বিভাগগুলো ধরা যায়। কোন বিষয়টা আপনার, বাছাইয়ে সাহায্য নিতে পারেন আমাদের Subject Review সিরিজের, যেমন সিএসই, আইন, অর্থনীতি কিংবা বিবিএ।
ভর্তি পরীক্ষা: মানবণ্টন ও GPA যোগ্যতা
মূল ইউনিটগুলোর পরীক্ষা হয় ১০০ নম্বরের: MCQ ৬০ + লিখিত ৪০, সময় ৪৫ + ৪৫ মিনিট (চারুকলার ধরনটা আলাদা, সেখানে অঙ্কনের পরীক্ষা থাকে)। এর সাথে SSC ও HSC-র GPA থেকে যোগ হয় ২০ নম্বর, অর্থাৎ মেধাক্রম দাঁড়ায় মোট ১২০ নম্বরের ওপর। মানে বোর্ড পরীক্ষার রেজাল্ট এখানে শুধু আবেদনের ছাড়পত্র না, সরাসরি নম্বরও।

আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা (সাম্প্রতিক সার্কুলার অনুযায়ী, ৪র্থ বিষয়সহ):
- বিজ্ঞান ইউনিট: SSC + HSC মিলিয়ে GPA কমপক্ষে 8.00, প্রতিটিতে কমপক্ষে 3.50
- কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান এবং ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিট: নিজ শাখা থেকে সাধারণত মিলিয়ে 7.50, প্রতিটিতে কমপক্ষে 3.00 (অন্য শাখা থেকে এলে শর্ত আলাদা)
- প্রতি বছরের সঠিক শর্ত, তারিখ আর ফি অবশ্যই অফিসিয়াল অ্যাডমিশন পোর্টালে দেখে নেবেন, এখানে সংখ্যাগুলো বদলায়
আরও দুটো জরুরি কথা। এক, ঢাবিতে সাধারণত সেকেন্ড টাইম নেই: শুধু সংশ্লিষ্ট বছরের HSC উত্তীর্ণরাই আবেদন করতে পারেন, তাই প্রথম সুযোগটাই আসল সুযোগ (নীতিমালা বদলায় কি না, সার্কুলারে নিশ্চিত হোন)। দুই, আবেদনের আগে নিজের GPA-র হিসাবটা পরিষ্কার রাখুন: জিপিএ ক্যালকুলেটরে রেজাল্ট সাজালে ইউনিটের শর্তের সাথে মেলানো এক মিনিটের কাজ, আর রেজাল্ট দেখা থেকে ভর্তির টাইমলাইন পর্যন্ত সব ধাপ আছে HSC Result দেখার নিয়ম গাইডে।
সাত কলেজ বিভ্রান্তি: ঢাবি আর সাত কলেজ এখন আলাদা
কয়েক বছর আগেও ঢাকা কলেজ, ইডেন, তিতুমীরসহ রাজধানীর সাতটা বড় সরকারি কলেজ ঢাবির অধিভুক্ত ছিল, ফলে “ঢাবির অধীনে পড়ি” কথাটার দুই রকম মানে তৈরি হয়ে বিভ্রান্তির শেষ ছিল না। সেই অধ্যায় শেষ: ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাবির অধীনে সাত কলেজের ভর্তি বন্ধ, আর অধ্যাদেশের মাধ্যমে কলেজগুলোকে নিয়ে গঠিত হয়েছে আলাদা প্রতিষ্ঠান, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে তারা নিজেদের ইউনিটভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষাও নিচ্ছে, ফলাফলও দিচ্ছে নিজেরাই।
আপনার জন্য মানে দাঁড়াল: ঢাবির ইউনিট পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হলে পড়বেন ঢাবির নিজস্ব ক্যাম্পাস-বিভাগে, আর সাত কলেজে ভর্তি হলে সেটা এখন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে, সার্টিফিকেটও ঢাবির না। ভর্তির ফর্ম তোলার আগে কোনটায় আবেদন করছেন, পরিষ্কার থাকুন।
হল ও ক্যাম্পাস জীবন: সত্যি কথাগুলো
ঢাবির আসল পাঠ্যক্রমের অর্ধেকটা চলে ক্লাসরুমের বাইরে: টিএসসি-র সংগঠনগুলো (বিতর্ক, নাটক, সাংবাদিকতা, ক্যারিয়ার ক্লাব), মধুর ক্যানটিনের রাজনীতি, চারুকলার বৈশাখ, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ভোরের লাইন। যাঁরা এই জগৎটা কাজে লাগান, চার বছর পরে তাঁদের সিভি আর নেটওয়ার্ক দুটোই আলাদা উচ্চতায় থাকে, বিসিএস থেকে করপোরেট, সব জায়গায় ঢাবির অ্যালামনাই-জাল কাজ করে।
এবার কঠিন সত্যটা: আবাসন। হলে সিট চাহিদার তুলনায় সবসময়ই কম, প্রথম বর্ষে বৈধ সিট পাওয়া এখনো সহজ না, আর গণরুম-ব্যবস্থার যে কুখ্যাতি ছিল, ২০২৪-পরবর্তী সময়ে সেটা ভাঙার বড় চেষ্টা চললেও আবাসন-সংকট নিজে এক রাতে মেটার জিনিস না। ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের বাস্তব প্রস্তুতি রাখা ভালো: শুরুর সেমিস্টারগুলোতে মেস-আত্মীয়ের বাসার বিকল্প ভাবনাও সাথে রাখুন।
সুবিধা-অসুবিধা: খোলামেলা হিসাব
- পক্ষে: দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ড-ভ্যালু আর অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক; ঢাকার কেন্দ্রে ক্যাম্পাস মানে টিউশনি, ইন্টার্নশিপ, চাকরির পরীক্ষা সব হাতের নাগালে; বিভাগ-বিষয়ের বিশাল বৈচিত্র্য; সংগঠন-সাংস্কৃতিক জীবনের গভীরতা; তুলনামূলক কম খরচে পড়াশোনা।
- বিপক্ষে: আবাসন-সংকট; বড় ব্যাচে ব্যক্তিগত মনোযোগ কম; ল্যাব-ক্লাসরুম সুবিধা বিভাগভেদে অসমান; মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্লাস-পরীক্ষার ছন্দপতন; সেশনজট আগের চেয়ে কমলেও বিভাগভেদে পুরোপুরি যায়নি।
মোদ্দা হিসাব: ঢাবি রেডিমেড সার্ভিস দেয় না, সুযোগ দেয়। যিনি নিজে খুঁজে নিতে জানেন, তাঁর জন্য এই ক্যাম্পাসের বিকল্প দেশে কমই আছে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ঢাবিতে কি সেকেন্ড টাইম পরীক্ষা দেওয়া যায়?
সাম্প্রতিক নিয়মে না, শুধু সেই বছরের HSC উত্তীর্ণরাই আবেদন করতে পারেন। এই নীতি নিয়ে আলোচনা মাঝেমধ্যেই হয়, তাই নিজের বছরের সার্কুলারে চূড়ান্ত অবস্থা দেখে নিন।
কোন ইউনিটে কোন বিভাগ থেকে আবেদন করা যায়?
বিজ্ঞান ইউনিট মূলত বিজ্ঞান বিভাগের জন্য, কলা-আইন-সামাজিক বিজ্ঞান আর ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে তিন বিভাগ থেকেই আবেদনের পথ আছে, তবে শাখাভেদে GPA শর্ত আর পরীক্ষার বিষয় আলাদা। বিভাগ বদলে পড়তে চাইলে (যেমন বিজ্ঞান থেকে ব্যবসায়) সার্কুলারের ইউনিট-নিয়মটা মন দিয়ে পড়ুন।
IBA-র ভর্তি কি ইউনিট পরীক্ষার সাথেই হয়?
না, IBA-র BBA প্রোগ্রামের পরীক্ষা সম্পূর্ণ আলাদা, ধরনও ভিন্ন (ইংরেজি-ম্যাথ-অ্যানালিটিক্যাল ঘরানার)। IBA টার্গেট করলে আলাদা প্রস্তুতি লাগবেই, বিস্তারিত আমাদের বিবিএ রিভিউতে আছে।
ভর্তি পরীক্ষায় নেগেটিভ মার্কিং আছে?
MCQ অংশে ভুল উত্তরে নম্বর কাটার নিয়ম থাকে, সঠিক হার সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়। অনুমাননির্ভর দাগানোর অভ্যাস থাকলে প্রস্তুতির সময়েই সেটা ঝেড়ে ফেলুন।
হলে সিট কীভাবে পাওয়া যায়?
ভর্তির সময় প্রত্যেকে একটা হলে সংযুক্ত (attached) হন, কিন্তু সংযুক্তি মানেই সিট না। বৈধ সিট আসে হল প্রশাসনের বরাদ্দে, সাধারণত অপেক্ষা আর ফলাফলের ভিত্তিতে। ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থী হলে প্রথম বছরের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার পরিকল্পনা সাথে রাখুন।
সাত কলেজের সার্টিফিকেটে কি ঢাবির নাম থাকবে?
নতুন ভর্তি হওয়াদের ক্ষেত্রে না, ২০২৪-২৫ থেকে সাত কলেজের ভর্তি ঢাবির অধীনে হচ্ছে না। আগের ব্যাচগুলোর (ঢাবি-অধিভুক্ত আমলের) সনদ সংশ্লিষ্ট নিয়মে ঢাবির অধীনেই সম্পন্ন হওয়ার কথা, এ নিয়ে হালনাগাদ তথ্য কর্তৃপক্ষের ঘোষণায় পাবেন।
প্রস্তুতি কবে থেকে, কীভাবে শুরু করব?
HSC-র পরপরই, রেজাল্টের অপেক্ষায় বসে না থেকে। মূল বইয়ে দখল + বিগত বছরের প্রশ্ন + লিখিত অংশের জন্য নিজের ভাষায় গুছিয়ে লেখার চর্চা, এই তিনটাই মূল স্তম্ভ। রেজাল্ট দেখার পর GPA-র ২০ নম্বরের হিসাবটা জানতে জিপিএ ক্যালকুলেটর আর জিপিএ গাইড দেখে নিন।


মতামত (২)