দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম পুরোপুরি সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করা প্রতিষ্ঠান, আর প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা শাবিপ্রবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি, কিন্তু ভর্তির প্রশ্নে বিভ্রান্তিও বেশি, কারণ এখানে ভর্তি হয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে। এই রিভিউতে সেই প্রক্রিয়াসহ পড়াশোনা, সাবজেক্ট আর ক্যাম্পাসের বাস্তব ছবিটা দিচ্ছি।
সূচিপত্র
এক নজরে শাবিপ্রবি
১৯৯১ সালে সিলেটে যাত্রা শুরু করা SUST দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ৩২০ একরের টিলাঘেরা ক্যাম্পাসে ৩০-এর বেশি বিভাগ আর প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী। শুরু থেকেই সেমিস্টার পদ্ধতি আর ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর চর্চা এখানকার আলাদা পরিচয়; সেশনজট তুলনামূলক কম থাকার পেছনে এই কাঠামোরই বড় ভূমিকা।
প্রযুক্তির দিকে ঝোঁক থাকলেও SUST শুধু বিজ্ঞান-প্রযুক্তির জায়গা না। সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইংরেজি, ব্যবসায় প্রশাসনসহ অনেক বিভাগ আছে। তবে জাতীয়ভাবে যে বিভাগগুলোর জন্য SUST-র নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায় সেগুলো হলো CSE, SWE (সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং), আর্কিটেকচার আর পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং।

গুচ্ছ (GST) পদ্ধতিতে ভর্তি: ধাপে ধাপে
এটাই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির জায়গা, তাই ধাপগুলো পরিষ্কার করে বলি। শাবিপ্রবি এখন GST গুচ্ছভুক্ত, অর্থাৎ আলাদা করে “শাবিপ্রবির ভর্তি পরীক্ষা” বলে কিছু হয় না। প্রক্রিয়াটা এমন:
- গুচ্ছে আবেদন: gstadmission.ac.bd-তে নির্দিষ্ট সময়ে আবেদন করতে হয়। ইউনিট তিনটি: A (বিজ্ঞান), B (মানবিক), C (বাণিজ্য)
- গুচ্ছের ভর্তি পরীক্ষা: সব গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটাই MCQ পরীক্ষা, নিজের কাছের কেন্দ্রে দেওয়া যায়
- ফল ও মেধাক্রম: পরীক্ষার নম্বরের সাথে SSC-HSC-র ফল যোগ করে কেন্দ্রীয় মেধাতালিকা হয়
- বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আবেদন: এই ধাপটাই অনেকে মিস করেন। মেধাক্রম পাওয়ার পর শাবিপ্রবিতে আলাদাভাবে সাবজেক্ট চয়েস দিয়ে আবেদন করতে হয়, নির্দিষ্ট ফি দিয়ে
- মেধাতালিকা ও ভর্তি: শাবিপ্রবি নিজস্ব মেধাতালিকা প্রকাশ করে; ধাপে ধাপে মাইগ্রেশন হয়
আর্কিটেকচারে যেতে চাইলে বাড়তি একটা ধাপ আছে: আলাদা ড্রইং/ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে হয়। এটা আগে থেকে না জানলে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়, তাই বিজ্ঞপ্তি বেরোনোর সাথে সাথেই নিজের পছন্দের বিভাগের শর্তগুলো পড়ে নেওয়া উচিত। গুচ্ছের সময়সূচি প্রতি বছর বদলায়; ২০২৫-২৬ সেশনে আবেদনের সময় ছিল ১০ থেকে ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫।

কোন সাবজেক্ট কেমন
- CSE: শাবিপ্রবির সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন বিভাগ। প্রোগ্রামিং কনটেস্টের সংস্কৃতি এখানে শক্তিশালী, আর গ্র্যাজুয়েটদের বড় অংশ দেশি-বিদেশি সফটওয়্যার কোম্পানিতে যান
- SWE (সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং): দেশে হাতেগোনা কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে; CSE-র তুলনায় সফটওয়্যার তৈরির প্রক্রিয়া, টেস্টিং আর প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টে জোর বেশি
- আর্কিটেকচার: সৃজনশীল কাজ আর ড্রইংয়ে আগ্রহ থাকলে দারুণ জায়গা; পাঁচ বছরের কোর্স, কাজের চাপ বেশি
- পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং: দেশে খুব কম জায়গায় পড়ানো হয়; জ্বালানি খাতে বিশেষায়িত ক্যারিয়ারের সুযোগ
- ফরেস্ট্রি, GEB, ওশানোগ্রাফি: গবেষণা আর উচ্চশিক্ষার দিকে যেতে চাইলে ভালো ভিত
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অন্য পথগুলোর সাথে তুলনা করতে দেখুন আমাদের BUET রিভিউ আর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং রিভিউ।
ক্যাম্পাস-জীবন
সিলেট শহর থেকে ক্যাম্পাস কাছেই, টিলা আর সবুজে ঘেরা। শাবিপ্রবির ক্যাম্পাস-সংস্কৃতিতে দুটো জিনিস চোখে পড়ে: প্রযুক্তি-কেন্দ্রিক ক্লাব (প্রোগ্রামিং, রোবোটিকস, অ্যাস্ট্রোনমি) আর সাংস্কৃতিক সংগঠনের সহাবস্থান। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, ল্যাব সুবিধা আর গবেষণার পরিবেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারে বেশ ভালো।
হল আছে, তবে সবার জন্য পর্যাপ্ত না; অনেকে সিলেট শহরের মেসে থাকেন। সেমিস্টার পদ্ধতির কারণে পড়ার চাপ ধারাবাহিক, বছরে একবার পরীক্ষার চাপ নেওয়ার সুযোগ নেই, এটা কারও জন্য সুবিধা, কারও জন্য চ্যালেঞ্জ।
খরচের হিসাব
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় সেমিস্টার ফি তুলনামূলক কম, তবে অনেক পুরোনো পাবলিকের চেয়ে কিছুটা বেশি (বিভাগ ও ল্যাব-নির্ভরতার ওপর নির্ভর করে)। থাকা-খাওয়ায় সিলেটের খরচ ঢাকার চেয়ে কম; হলে সিট পেলে মাসিক খরচ অনেকটাই নেমে আসে। সব মিলিয়ে প্রাইভেটে একই বিষয় পড়ার তুলনায় খরচ কয়েক গুণ কম, যেটা NSU বা IUB রিভিউয়ের সংখ্যাগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখলেই পরিষ্কার হবে।
সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
শাবিপ্রবিতে ভর্তি হতে কি আলাদা পরীক্ষা দিতে হয়?
না, ভর্তি পরীক্ষা হয় গুচ্ছের (GST) অধীনে। তবে গুচ্ছের ফল আসার পর শাবিপ্রবিতে আলাদাভাবে সাবজেক্ট চয়েস দিয়ে আবেদন করতে হয়, এই ধাপটা বাদ দিলে ভর্তি হবে না।
আর্কিটেকচারের জন্য বাড়তি কী লাগে?
আলাদা ড্রইং বা ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে হয়। বিজ্ঞপ্তিতে আলাদা করে সময়সূচি দেওয়া থাকে।
সেশনজট কেমন?
সেমিস্টার পদ্ধতি শুরু থেকেই চালু থাকায় জট তুলনামূলক কম, তবে বিভাগভেদে পার্থক্য থাকে।
CSE নাকি SWE, কোনটা নেব?
দুটোরই চাকরির বাজার ভালো। কম্পিউটার সায়েন্সের তাত্ত্বিক ভিত (অ্যালগরিদম, সিস্টেম) চাইলে CSE; সফটওয়্যার তৈরির প্রক্রিয়া, টেস্টিং আর ম্যানেজমেন্টে আগ্রহ থাকলে SWE।
গুচ্ছে কম নম্বর পেলে কি শাবিপ্রবিতে সুযোগ থাকে?
মেধাক্রম যত ওপরে, পছন্দের বিভাগ পাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। নম্বর কম হলেও আবেদন করে রাখা উচিত, কারণ মাইগ্রেশনের ধাপে অনেকেই পরে সুযোগ পান।

