সূচিপত্র
মেধাতালিকায় নাম আসেনি — এই খবরটা পাওয়ার দিন মনে হয় দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মেই লেখা আছে দ্বিতীয় দরজার নাম: রিলিজ স্লিপ — নতুন করে পাঁচটা কলেজ বেছে আবার আবেদনের সুযোগ, আগের আবেদনের কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই। প্রতি বছর হাজারো শিক্ষার্থী এই পথেই ভর্তি হন; আর প্রতি বছরই আরও অনেকে ভুল কলেজ-বাছাই বা ডেডলাইন-মিসে সুযোগটা হারান।
আমাদের এনইউ অনার্স ভর্তি গাইডের এই ফলো-আপে রিলিজ স্লিপের পুরো খেলাটা: কারা পাবেন, কীভাবে আবেদন, আর সবচেয়ে জরুরি — পাঁচটা কলেজ বাছার বুদ্ধিটা।
সংক্ষেপে যা জানা দরকার
- রিলিজ স্লিপ = মূল মেধাতালিকা-পর্ব শেষে নতুন করে ৫টা কলেজে আবেদনের সুযোগ
- আবেদন করতে পারেন তিন দলের যে কেউ: চান্স-না-পাওয়া, চান্স-পেয়ে-ভর্তি-না-হওয়া, আর ভর্তি-বাতিল-করা শিক্ষার্থীরা
- আবেদন সম্পূর্ণ অনলাইনে, এনইউ-র ভর্তি পোর্টালে — কলেজ থেকে কোনো ফরম দেওয়া হয় না
- ১ম রিলিজ স্লিপে না হলে ২য় (এবং সাধারণত শেষ) রিলিজ স্লিপ আসে
- ফাঁকা আসনই এখানে মূলধন — তাই কৌশলটা আবেগের কলেজ না, আসন-ফাঁকা কলেজ
- সময়সূচি সাইকেলভেদে ভিন্ন — মূল ভর্তি-পর্ব শেষের পর নোটিশে চোখ রাখুন
রিলিজ স্লিপ আসলে কী, আর কেন এটা শেষ নয়, সুযোগ
এনইউ-র মূল ভর্তি চলে কলেজ ধরে: আপনি একটা কলেজে আবেদন করেন, সেই কলেজের মেধাতালিকায় লড়েন। সমস্যা হলো, জনপ্রিয় কলেজে ভিড় উপচে পড়ে, আর কম-পরিচিত বহু কলেজে আসন ফাঁকাই থেকে যায়। রিলিজ স্লিপ এই দুই বাস্তবতার সেতু: মূল পর্ব শেষে ফাঁকা আসনগুলো সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়, আর আপনি এক আবেদনে পাঁচটা কলেজ পর্যন্ত বেছে সেই ফাঁকা আসনে লড়তে পারেন — মেধা (GPA) সেই একই, শুধু মাঠটা নতুন।
মানসিক হিসাবটাও বদলান: রিলিজ স্লিপ “ব্যর্থদের লাইন” না — অনেকে সচেতনভাবেই এটা ব্যবহার করেন, যেমন প্রথম দফায় উচ্চাশার কলেজে চেষ্টা করে পরে বাস্তবসম্মত পছন্দে ফেরা, কিংবা ভর্তি হয়ে যাওয়া কলেজ-বিষয় পছন্দ না হলে বাতিল করে নতুন সুযোগ নেওয়া। নিয়ম আপনাকে এই নমনীয়তা দিচ্ছেই — ব্যবহার করতে জানাটাই দক্ষতা।
কারা আবেদন করতে পারবেন: তিনটা শর্ত

- শর্ত ১ — মেধাতালিকায় স্থান পাননি: মূল আবেদন করেছিলেন, কিন্তু ১ম-২য় (ও কোটার) কোনো তালিকায় নাম আসেনি
- শর্ত ২ — স্থান পেয়েও ভর্তি হননি: তালিকায় নাম এসেছিল, কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ভর্তি সম্পন্ন করেননি (ইচ্ছা করে হোক বা ভুলে)
- শর্ত ৩ — ভর্তি বাতিল করেছেন: ভর্তি হয়ে গিয়েছিলেন, পরে নিয়ম মেনে ভর্তি বাতিল করেছেন — বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে রিলিজ স্লিপের দরজা খোলা
খেয়াল করুন: মূল আবেদনটা করা থাকতেই হবে — যিনি মূল পর্বে আবেদনই করেননি, রিলিজ স্লিপ তাঁর জন্য না। আর GPA-যোগ্যতার শর্তগুলো মূল ভর্তির মতোই (হিসাব ঝালিয়ে নিতে জিপিএ ক্যালকুলেটর)।
আবেদনের ধাপ
- নোটিশ দেখুন: মূল ভর্তি-পর্ব (২য় তালিকা পর্যন্ত) শেষ হলে এনইউ-র সাইটে রিলিজ স্লিপের বিজ্ঞপ্তি আসে — তারিখটা সাইকেলভেদে ভিন্ন, তাই নোটিশই একমাত্র ঘড়ি
- পোর্টালে লগইন: মূল আবেদনের রোল-পিন দিয়ে ভর্তি পোর্টালে ঢুকে রিলিজ স্লিপ অপশনে যান — কলেজ কোনো ফরম দেয় না, পুরোটাই অনলাইন
- ৫টা কলেজ ও বিষয়-পছন্দ দিন: প্রতিটা কলেজের জন্য বিষয়-পছন্দক্রম সাজিয়ে (পরের সেকশনের কৌশল মেনে) সাবমিট করুন
- ফল ও ভর্তি: রিলিজ স্লিপের মেধাতালিকায় নাম এলে নির্ধারিত সময়ে কাগজপত্রসহ সেই কলেজে ভর্তি — এখানে দেরি মানেই সুযোগ শেষ
৫ কলেজ বাছাইয়ের কৌশল: এখানেই জেতা-হারা

- ফাঁকা আসন খুঁজুন, নাম না: মূল পর্বে যে কলেজে ভিড় ছিল, রিলিজ স্লিপেও সেখানে আসন কম — বরং কম-আলোচিত সরকারি কলেজ আর ভালো মানের বেসরকারি কলেজগুলোতেই ফাঁকা থাকে বেশি
- ৫টা স্লটের সবগুলো ব্যবহার করুন: দুটো-তিনটা দিয়ে জমা দেওয়া মানে নিজের সম্ভাবনা নিজে কাটা — পাঁচটাই দিন, স্তর সাজিয়ে: ১-২টা কাঙ্ক্ষিত, ২টা বাস্তবসম্মত, ১-২টা প্রায়-নিশ্চিত
- বিষয়কে অগ্রাধিকার দিন: কম-চেনা কলেজে পছন্দের বিষয় পাওয়া, চেনা কলেজে অপছন্দের বিষয়ের চেয়ে প্রায় সবসময় ভালো সিদ্ধান্ত — ৪ বছর পড়বেন বিষয়টাই। বিষয় বাছাইয়ে দ্বিধা থাকলে আমাদের Subject Review সিরিজ (যেমন হিসাববিজ্ঞান, ইংরেজি) ঘুরে আসুন
- দূরত্ব-খরচের হিসাব রাখুন: বাড়ি থেকে পড়ার সুবিধা এনইউ-র সবচেয়ে বড় প্লাস — অচেনা জেলার কলেজ লেখার আগে থাকা-খাওয়ার বাজেট ভাবুন
- ক্লাস-হয়-কি-না যাচাই: তাড়াহুড়োর মধ্যেও এক ফোন সিনিয়র বা পরিচিত কাউকে — নিয়মিত ক্লাস আর পরীক্ষার রেকর্ডই কলেজের আসল রিভিউ
২য় রিলিজ স্লিপ ও তারপর
১ম রিলিজ স্লিপেও কোথাও নাম না এলে হতাশ হওয়ার আগে জানুন: আসন ফাঁকা থাকা সাপেক্ষে ২য় রিলিজ স্লিপ আসে, আর সেটাই সাধারণত ওই শিক্ষাবর্ষের শেষ সুযোগ। ২য় দফায় কৌশল আরও ঠান্ডা মাথার: এবার শুধুই প্রায়-নিশ্চিত পছন্দ — যেসব কলেজ-বিষয়ে আগের দফাগুলোতেও আসন ফাঁকা ছিল।
তারপরও না হলে বিকল্পগুলো মনে রাখুন: ডিগ্রি (পাস) কোর্সে ভর্তি হয়ে পরে মাস্টার্সের পথ, পরের শিক্ষাবর্ষে নতুন করে চেষ্টা (পাসের সালের সীমা সার্কুলারে দেখে), কিংবা কারিগরি-পেশাগত অন্য পথ। দরজা একটার বেশি — পুরো ম্যাপটা এনইউ ভর্তি গাইডে।
যে ভুলগুলো সুযোগ নষ্ট করে
- ডেডলাইন মিস: রিলিজ স্লিপের উইন্ডো ছোট — নোটিশ দেখার দায়িত্ব পুরোটাই আপনার; রেজাল্টের পর থেকে এনইউ-র সাইটে নিয়মিত ঢুঁ দেওয়াটাই বিমা
- আবেগের ৫ কলেজ: পাঁচটাই জনপ্রিয় কলেজ লিখে জমা দেওয়া মানে মূল পর্বের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি — অন্তত দুটো স্লট নিরাপদ রাখুন
- ভর্তি-বাতিলের প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ রাখা: বাতিল করব-করছি ঝুলিয়ে রাখলে রিলিজ স্লিপের যোগ্যতাই আটকে যেতে পারে — সিদ্ধান্ত নিলে নিয়ম মেনে দ্রুত সম্পন্ন করুন
- ভুল তথ্যে ভরসা: “অমুক কলেজে টাকা দিলে হয়ে যাবে” ঘরানার দালাল-গল্প এনইউ-তেও ঘোরে — পুরো প্রক্রিয়া অনলাইন ও মেধাভিত্তিক, টাকার গল্প মানেই প্রতারণা
- ফল দেখে বসে থাকা: রিলিজ স্লিপে নাম আসার পরেও নির্ধারিত সময়ে ভর্তি সম্পন্ন না করলে সব পরিশ্রম শূন্য
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
রিলিজ স্লিপে আবেদনের জন্য কি নতুন ফি লাগে?
সাম্প্রতিক সাইকেলগুলোতে রিলিজ স্লিপের অনলাইন আবেদন-ধাপে আলাদা বড় ফি রাখা হয়নি (মূল আবেদনেই ফি নেওয়া হয়) — তবে নিয়ম-ফি সাইকেলভেদে বদলাতে পারে, বিজ্ঞপ্তিই চূড়ান্ত। ভর্তি হওয়ার সময় কলেজের ভর্তি-ফি তো লাগবেই।
মূল আবেদনের কলেজগুলোই কি আবার দিতে হবে?
না — রিলিজ স্লিপের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা এটাই: আগের আবেদনের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই, সম্পূর্ণ নতুন ৫টা কলেজ বাছতে পারবেন (চাইলে আগেরটাও রাখতে পারেন)।
রিলিজ স্লিপেও কি মেধাতালিকা GPA দিয়েই হয়?
হ্যাঁ — মানদণ্ড বদলায় না, SSC+HSC-র (৪র্থ বিষয়সহ) ফলই মেধা। বদলায় শুধু প্রতিযোগিতার মাঠ: ফাঁকা আসনের কলেজে একই GPA অনেক বেশি কাজ করে।
১ম রিলিজ স্লিপে ভর্তি হয়ে গেলে কি ২য়টায় আবার চেষ্টা করা যায়?
ভর্তি হয়ে গেলে সেখানেই থিতু হওয়াই নিয়মের সরল পথ; নতুন করে সুযোগ নিতে হলে আবার বাতিলের প্রক্রিয়ায় যেতে হয় — বারবার এই চক্করে সময় আর টাকা দুটোই যায়। তাই ভর্তির আগে ভাবুন, পরে না।
রিলিজ স্লিপ কখন আসবে, নির্দিষ্ট তারিখ বলা যায় না?
না — সাইকেলভেদে সময় অনেকটাই সরে (কোনো বছর মাঝ-বছরে, কোনো বছর শেষদিকে খুলেছে)। নির্ভরযোগ্য নিয়ম একটাই: ২য় মেধাতালিকার ভর্তি-পর্ব শেষ হওয়ার পরের নোটিশগুলোতে চোখ রাখা।
ডিগ্রি (পাস) কোর্সে ভর্তি হয়ে পরে কি অনার্সে আসা যায়?
ডিগ্রিতে ভর্তি মানে সেই ট্র্যাকেই এগোনো — পরে মাস্টার্স করে একই গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, তবে মাঝপথে অনার্সে “ট্রান্সফার” ঘরানার সহজ পথ নেই। তাই রিলিজ স্লিপের দুই দফা পুরোপুরি ব্যবহার করার পরই এই সিদ্ধান্তে যান।

