সূচিপত্র
মানবিকের ভর্তিযুদ্ধে ইংরেজি বরাবরই প্রথম সারির নাম: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সবখানে এই বিভাগের আসনের জন্য লড়াই তুমুল। অথচ ভর্তি হতে চাওয়া মানুষদের একটা বড় অংশই জানেন না ভেতরে ঠিক কী পড়ানো হয়, আর সেই না-জানার খেসারত দেন প্রথম সেমিস্টারেই, চসারের চৌদ্দ শতকের ইংরেজির সামনে বসে।
Subject Review সিরিজের এই কিস্তি, an english subject review in Bangla, শুরুই হচ্ছে সেই ভুল ধারণা ভাঙা দিয়ে।
ইংরেজি সাবজেক্ট রিভিউ (English Subject Review): সংক্ষেপে
- পড়ার বিষয়: মূলত ইংরেজি সাহিত্য (কবিতা, নাটক, উপন্যাস, সমালোচনা তত্ত্ব), সাথে ভাষাতত্ত্ব ও ELT
- যা না: এটা স্পোকেন ইংলিশ বা গ্রামার শেখার কোর্স না
- কোথায়: সব বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ (সবচেয়ে বড় দল), প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
- ক্যারিয়ার: শিক্ষকতা ও ELT, বিসিএস, মিডিয়া, কর্পোরেট কমিউনিকেশনস, কনটেন্ট-ফ্রিল্যান্সিং, উন্নয়ন খাত
- বাস্তবতা: দরজা অনেকগুলো, কিন্তু কোনোটাই অটোমেটিক খোলে না, ডিগ্রির পাশে নিজের স্কিল-প্রোফাইল গড়তে হয়
সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটা আগে ভাঙা যাক

“ইংরেজিতে অনার্স করলে ইংরেজিটা ঝরঝরে হয়ে যাবে”, এই আশায় ভর্তি হওয়া মানুষের সংখ্যা বিপুল, আর হতাশ হওয়া মানুষের সংখ্যাও। পরিষ্কার করে বলা যাক: ইংরেজিতে অনার্স মানে ইংরেজি সাহিত্যের ডিগ্রি। শেক্সপিয়ারের নাটক, রোমান্টিক কবিতা, ভিক্টোরিয়ান উপন্যাস, উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য, সমালোচনা তত্ত্ব, এগুলোই মূল খাবার। ভাষাটা এখানে মাধ্যম, গন্তব্য না।
তবে উল্টো পিঠটাও সত্যি: চার বছর ইংরেজিতে পড়া, লেখা, তর্ক করা আর হাজার পৃষ্ঠা সাহিত্য গেলার পর ভাষার দখল এমনিতেই অন্য উচ্চতায় চলে যায়। মানে ফলটা মেলে, তবে বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে; স্পোকেনের শর্টকাট খুঁজলে তিন মাসের কোর্সই যথেষ্ট, চার বছরের অনার্স না।
ইংরেজিতে অনার্সে আসলে কী পড়ানো হয়?
- সাহিত্যের ইতিহাস ধরে যাত্রা: চসার থেকে শেক্সপিয়ার, মিল্টন, রোমান্টিকস (ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কিটস), ভিক্টোরিয়ানস, মডার্নিজম (এলিয়ট, জয়েস), হালের সাহিত্য পর্যন্ত
- উত্তর-ঔপনিবেশিক ও বিশ্বসাহিত্য: আচেবে, রুশদি, আমাদের এই অঞ্চলের ইংরেজি লেখালেখিসহ
- সমালোচনা তত্ত্ব: টেক্সট পড়ার চশমাগুলো, ফেমিনিজম, মার্ক্সিজম, পোস্ট-কলোনিয়ালিজম
- ভাষাতত্ত্ব ও ELT: ভাষা কীভাবে কাজ করে, আর কীভাবে শেখাতে হয়, শিক্ষকতার ক্যারিয়ারের সরাসরি প্রস্তুতি
- লেখালেখি: অ্যাকাডেমিক রাইটিং, এসে, প্রেজেন্টেশন, যে দক্ষতা পরে চাকরির বাজারে সবচেয়ে দামি প্রমাণ হয়
কোথায় পড়া যায়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ দেশের সাহিত্যচর্চার ঐতিহাসিক ঠিকানাগুলোর একটা, ভর্তি কলা ইউনিটের তুমুল প্রতিযোগিতা পেরিয়ে। জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ সব বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগটা আছে। সংখ্যায় সবচেয়ে বড় দলটা পড়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতে, যেখানে ইংরেজি মানবিকের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলোর একটা। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ইংরেজি প্রায় সর্বজনীন, সেখানে সাধারণত সাহিত্যের সাথে ভাষাতত্ত্ব-ELT-র ভাগটা বড়।
তিন বিভাগ থেকেই ইংরেজিতে আসা যায়, তবে ইউনিট আর শর্ত বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে আলাদা। নিজের রেজাল্ট জিপিএ ক্যালকুলেটরে সাজিয়ে সার্কুলারের শর্ত মিলিয়ে নিন, আর বিভাগ বাছাইয়ে দ্বিধায় থাকলে সায়েন্স, কমার্স নাকি মানবিক লেখাটা কাজে দেবে।
ক্যারিয়ার: শিক্ষকতা থেকে কনটেন্ট পর্যন্ত

- শিক্ষকতা ও ELT: সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। স্কুল-কলেজ, ইংলিশ মিডিয়াম, বিশ্ববিদ্যালয়, ভাষা শেখানোর প্রতিষ্ঠান। CELTA/TESOL-এর মতো আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেট (তথ্য মিলবে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাইটে) যোগ করলে দেশে-বিদেশে ELT ক্যারিয়ারের ওজন বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
- বিসিএস ও সরকারি: ইংরেজি গ্র্যাজুয়েটদের বিসিএসে ঐতিহ্যগত সুনাম আছে, পরীক্ষার ইংরেজি অংশে স্বাভাবিক সুবিধার কারণে; পররাষ্ট্র-প্রশাসনের মতো ক্যাডারে এই বিভাগের মুখ নিয়মিত।
- মিডিয়া ও সাংবাদিকতা: ইংরেজি দৈনিক, টিভির ইংরেজি ডেস্ক, অনলাইন পোর্টাল, অনুবাদ।
- কর্পোরেট কমিউনিকেশনস: বড় কোম্পানি, ব্যাংক, টেলিকমের কমিউনিকেশনস-ব্র্যান্ডিং-HR বিভাগ, যেখানে নির্ভুল ইংরেজি লেখার লোক সোনার হরিণ।
- কনটেন্ট ও ফ্রিল্যান্সিং: কনটেন্ট রাইটিং, কপিরাইটিং, এডিটিং, প্রুফরিডিংয়ের দেশি-বিদেশি (রিমোট) বাজার গত এক দশকে বহুগুণ বড় হয়েছে, ঘরে বসে ডলারে আয়ের সবচেয়ে বাস্তব পথগুলোর একটা এখন ভালো ইংরেজি লেখা।
- উন্নয়ন খাত ও এনজিও: রিপোর্ট, প্রপোজাল, ডকুমেন্টেশনের কাজে ইংরেজি গ্র্যাজুয়েটদের নিয়মিত চাহিদা।
বেতনের সৎ ছবি: এন্ট্রি লেভেলে অঙ্কটা ক্ষেত্রভেদে খুব ওঠানামা করে, স্কুল-শিক্ষকতা বা ছোট প্রতিষ্ঠানে শুরুটা সাদামাটা, কর্পোরেট-মাল্টিন্যাশনালে ভদ্রস্থ। এই বিষয়ে আয়ের সিলিংটা নির্ধারণ করে ডিগ্রি না, পোর্টফোলিও: কী লিখেছেন, কোথায় পড়িয়েছেন, কোন সার্টিফিকেট আছে।
ডিগ্রির পাশে কোন স্কিল যোগ করবেন
- শিক্ষকতা টার্গেটে: ELT-র কোর্সগুলো মন দিয়ে + CELTA/TESOL-এর পরিকল্পনা
- কর্পোরেট-কনটেন্ট টার্গেটে: লেখার পোর্টফোলিও (ব্লগ, ক্যাম্পাস পত্রিকা, ফ্রিল্যান্স স্যাম্পল), SEO রাইটিংয়ের বেসিক, প্রেজেন্টেশন টুল
- বিসিএস টার্গেটে: তৃতীয়-চতুর্থ বর্ষ থেকেই সাধারণ জ্ঞান-গণিতের প্রস্তুতি আলাদা করে, কারণ ওই অংশগুলো সিলেবাসে নেই
- সবার জন্য: নির্ভুল টাইপিং-ফরম্যাটিং, আর অন্তত একটা কাজ চালানোর মতো দ্বিতীয় দক্ষতা (ডিজাইন, ডেটা, ভিডিও এডিটিং, যেটা টানে)
কাদের জন্য ইংরেজি, কাদের জন্য না
ইংরেজি তাঁদের জন্য, যাঁরা পড়তে ভালোবাসেন, সত্যিই ভালোবাসেন: সপ্তাহে একটা উপন্যাস আর গোছা গোছা কবিতা সিলেবাসেই আসবে। যাঁরা ভাষা-সংস্কৃতি-ইতিহাসের সংযোগে আগ্রহী, লেখালেখিতে হাত আছে বা গড়তে চান, আর ক্যারিয়ারের নমনীয়তাকে সুযোগ হিসেবে দেখেন, বোঝা হিসেবে না।
আর যাঁরা শুধু স্পোকেন শিখতে চান (তিন মাসের কোর্সই যথেষ্ট), সাহিত্য পড়াকে সময় নষ্ট মনে করেন, কিংবা ডিগ্রি শেষে একটা নির্দিষ্ট চাকরির গ্যারান্টি খোঁজেন, তাঁদের জন্য এই বিভাগ হতাশার কারণ হতে পারে। আইন-ঘেঁষা ঝোঁক থাকলে বিকল্প হিসেবে দেখুন আমাদের আইন রিভিউ, ব্যবসার দিকে গেলে বিবিএ রিভিউ।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ইংরেজিতে দুর্বল হলে কি ইংরেজিতে অনার্স নেওয়া যাবে?
ভর্তি পরীক্ষা পেরোতে পারলে নেওয়া যাবে, তবে প্রথম বছরটা কঠিন লাগবে, কারণ লেকচার-রিডিং-পরীক্ষা সবই ইংরেজিতে। দুর্বলতা থাকলে ভর্তির আগের মাসগুলোতে রিডিং অভ্যাস (সহজ ইংরেজি উপন্যাস, পত্রিকা) গড়ে নিলে ধাক্কাটা অনেক কমে।
বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ইংরেজিতে আসা যায়?
যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ইউনিটগুলোতে অন্য বিভাগের জন্য আসন-নিয়ম থাকে (শর্ত সার্কুলারে), আর প্রতি বছরই বিজ্ঞানের অনেকে আসেন। HSC-তে ইংরেজিতে ভালো নম্বর থাকলে সুবিধা।
ইংরেজি সাহিত্য নাকি ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং (ELT), মাস্টার্সে কোনটা?
শিক্ষকতা-ক্যারিয়ারে ELT সরাসরি কাজে লাগে, অ্যাকাডেমিয়া-গবেষণায় সাহিত্য। অনার্সে দুটোরই স্বাদ পাবেন, মাস্টার্সের সিদ্ধান্তটা তখন নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই নিতে পারবেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি পড়ে কি ভালো ক্যারিয়ার হয়?
হয়, তবে প্রতিযোগিতা বেশি বলে নিজেকে আলাদা করার দায়িত্বটাও বেশি: রেজাল্ট ধরে রাখা, লেখার পোর্টফোলিও গড়া, একটা সার্টিফিকেট যোগ করা। বিসিএস আর শিক্ষকতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি গ্র্যাজুয়েটদের সাফল্য নিয়মিত ঘটনা।
পড়া কি খুব কঠিন? পাস করা যায় তো?
কঠিনের ধরনটা আলাদা: অঙ্ক নেই, ল্যাব নেই, কিন্তু বিশাল রিডিং লোড আছে আর নিজের বিশ্লেষণ লিখতে পারার দাবি আছে। নিয়মিত পড়লে পাস কঠিন না; না পড়ে পরীক্ষার আগে গাইড মুখস্থ করার কৌশল এখানে সবচেয়ে খারাপ কাজ করে।
রেজাল্টের পর ভর্তির প্রস্তুতি কীভাবে সাজাব?
প্রথমে রেজাল্ট দেখে নিজের অবস্থান বুঝুন, তারপর কলা ইউনিটের প্রশ্নের ধরন (ইংরেজি অংশে জোর) ধরে প্রস্তুতি। হিসাবের কাজে জিপিএ ক্যালকুলেটর আর বাকি ফ্রি টুলগুলো তো আছেই।

