SSC-র রেজাল্ট হাতে পাওয়ার পর কয়েকটা দিনের মধ্যেই এই সিদ্ধান্তটা নিতে হয়, আর ততক্ষণে বাসার প্রায় সবাই নিজের মতামত জানিয়ে দিয়েছেন। চাচা বলবেন সায়েন্স, খালা বলবেন কমার্সে এখন অনেক চাহিদা, বন্ধুরা যে যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেই টানবে। এই লেখাটা সেই ভিড়ের মধ্যে একটু থেমে, আসলে কোন প্রশ্নগুলো নিজেকে করা উচিত সেটা নিয়ে।
এক মিনিটে নিজেকে মেলান
পুরো লেখা পড়ার আগে, নিচের তিনটা বাক্সে একবার চোখ বুলিয়ে নিন। যেটাতে সবচেয়ে বেশি লাইনের সাথে নিজেকে মিলিয়ে ফেলতে পারছেন, সেটাই সাধারণত আপনার স্বাভাবিক টান কোন দিকে তার একটা ভালো ইঙ্গিত।
বিজ্ঞান আপনার জন্য, যদি
- “কেন এমন হয়” প্রশ্নটা আপনাকে অস্থির করে তোলে
- অঙ্ক বা সূত্র নিয়ে ভুল হলেও আবার চেষ্টা করতে বিরক্ত লাগে না
- ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল বা গবেষণার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখতে চান
- প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা পড়াশোনায় দিতে রাজি আছেন, বিষয়ের চাপ তুলনামূলক বেশি
ব্যবসায় শিক্ষা আপনার জন্য, যদি
- টাকা কীভাবে ঘোরে, বাজার কীভাবে চলে, এসব প্রশ্ন কৌতূহলী করে তোলে
- ব্যাংকিং, উদ্যোক্তা হওয়া বা কর্পোরেট চাকরির দিকে ঝোঁক আছে
- হিসাব আর সংখ্যায় স্বাচ্ছন্দ্য আছে, কিন্তু বিজ্ঞানের ল্যাব-নির্ভর গভীরতায় আগ্রহ কম
- বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে ভালো লাগে, তত্ত্বের চেয়ে প্রয়োগে বেশি আগ্রহী
মানবিক আপনার জন্য, যদি
- মানুষ, সমাজ, ইতিহাস বা রাজনীতি নিয়ে পড়তে বা তর্ক করতে ভালো লাগে
- লেখালেখি, বিতর্ক বা মতামত প্রকাশে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন
- প্রশাসন, সাংবাদিকতা, আইন বা শিক্ষকতার মতো পথে আগ্রহ আছে
- মুখস্থের বদলে বিশ্লেষণ আর যুক্তি সাজাতে ভালো লাগে
তিনটা বাক্সেই কিছু না কিছু মিলে যাওয়া স্বাভাবিক, বেশিরভাগ মানুষই তিন ধরনের আগ্রহ কমবেশি বহন করেন। আসল কাজ হলো কোনটা সবচেয়ে বেশি টানে সেটা বোঝা, একেবারে নিখুঁত এক দিকে মেলা না।
তিন বিভাগের বাস্তব তুলনা
এবার একটু ব্যবহারিক দিক থেকে দেখা যাক। নিচের টেবিলে তিন বিভাগের পড়ার চাপ, গণিতনির্ভরতা আর ভবিষ্যতের সুযোগ পাশাপাশি রাখা হলো।
| বিভাগ | বিষয়ের চাপ | গণিতনির্ভরতা | পরে যা পড়া যায় | সাধারণ ক্যারিয়ার দিক |
|---|---|---|---|---|
| বিজ্ঞান | বেশি | উচ্চ | ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল, বিশুদ্ধ বিজ্ঞান, এমনকি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কমার্স-মানবিকের বিষয়ও | ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, শিক্ষকতা |
| ব্যবসায় শিক্ষা | মাঝারি | মাঝারি | বিবিএ, অ্যাকাউন্টিং, ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং-সংশ্লিষ্ট বিষয় | ব্যাংকার, উদ্যোক্তা, কর্পোরেট চাকরি |
| মানবিক | তুলনামূলক কম | কম | আইন, সাংবাদিকতা, সমাজবিজ্ঞান, ভাষা, প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট বিষয় | আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রশাসন, শিক্ষকতা |

একটা জিনিস এই টেবিল থেকে স্পষ্ট, বিজ্ঞান বিভাগ পরে সবচেয়ে বেশি দরজা খোলা রাখে। বিজ্ঞান থেকে চাইলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কমার্স বা মানবিকের বিষয়েও ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া যায়, কিন্তু উল্টোটা প্রায় কখনোই যায় না, কমার্স বা মানবিক থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিকেলে বসার সুযোগ থাকে না। এই একমুখী দরজার কথাটা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো, তবে এর মানে এই না যে সবারই বিজ্ঞান পড়া উচিত। যে পথে আগ্রহ নেই সেই পথের দরজা খোলা রাখার জন্য তিন বছর কষ্ট করাটা একটা আলাদা রকম মূল্য দেওয়া, সেই মূল্যটা আপনার কাছে যৌক্তিক মনে হচ্ছে কিনা সেটাই আসল প্রশ্ন।
একটা ভুল ধারণা যেটা ভাঙা দরকার
“মেধাবীরা সায়েন্সে যায়, বাকিরা যেখানে জায়গা হয় সেখানে যায়”, এই কথাটা এখনো অনেক জায়গায় শোনা যায়, স্কুলের শিক্ষকরুম থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজনের আড্ডা পর্যন্ত। কথাটা সরাসরি ভুল। মেধা একটা নির্দিষ্ট দিকে ঢালাই করা কোনো জিনিস না, একজনের ভাষার মেধা আরেকজনের সংখ্যার মেধার চেয়ে কম না, শুধু আলাদা।
দেশের প্রথম সারির আইনজীবী, সাংবাদিক বা ব্যাংকার হয়ে যাঁরা নিজের ক্ষেত্রে সেরা জায়গায় পৌঁছেছেন, তাঁদের প্রায় সবাই মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষা থেকে এসেছেন, ব্যর্থ সায়েন্স স্টুডেন্ট হয়ে না, নিজের পছন্দের বিষয়ে সেরা হয়ে। বিপরীতে, শুধু “ভালো ছাত্র” তকমার জন্য সায়েন্সে ভর্তি হয়ে তিন বছর ধরে বিষয়টা টেনে নিয়ে যাওয়া, ভালো না লাগার পরও, এমন গল্পও কম না। যেটা আসলে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো বিষয়টার সাথে আপনার সত্যিকারের সম্পর্ক, বিষয়টার সামাজিক মর্যাদা না।
এখনো দ্বিধায় থাকলে
তিনটা বাক্স পড়েও যদি এখনো স্পষ্ট না লাগে, নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করে দেখুন:
- স্কুলের কোন ক্লাসের পড়া শেষ হয়ে গেলেও মন খারাপ হতো, আরও শুনতে ইচ্ছা করত?
- পরীক্ষার বাইরে, নিজের ইচ্ছায় কোন বিষয়ের বই বা ভিডিও দেখে সময় কাটিয়েছেন?
- দশ বছর পর নিজেকে কোন ধরনের কাজে দেখতে চান, ল্যাবে, অফিসে, নাকি আদালতে বা নিউজরুমে?
- পরিবারের চাপ সরিয়ে রাখলে, একদম নিজের সিদ্ধান্তে কোনটা বেছে নিতেন?
শেষ প্রশ্নটাই সবচেয়ে কঠিন, কারণ পরিবারের চাপ সরানো সহজ না। তবে এটুকু বলা যায়, তিন বছর পড়াশোনা করবেন আপনি, পরিবার না। যে বিভাগেই যান, সিদ্ধান্তটা যেন শেষমেশ নিজের হয়।
গ্রুপ বদলানো যায়, কিন্তু সহজ না
SSC-র পর একবার একটা গ্রুপ বেছে নিলে সেটাই যে চিরস্থায়ী বন্দিত্ব, তা না। HSC-র শুরুতে গ্রুপ বদলানোর সুযোগ থাকে অনেক প্রতিষ্ঠানেই, তবে শর্ত থাকে, আর দেরিতে সিদ্ধান্ত নিলে সেই বাড়তি বিষয়গুলো পড়ে ধরার চাপও বাড়ে। তাই “ভুল হলে পরে ঠিক করে নেব” ভেবে একেবারে খেয়ালখুশি মতো বেছে নেওয়ার চেয়ে, শুরুতেই একটু সময় নিয়ে ভাবাটাই লাভজনক।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
কোন গ্রুপে সবচেয়ে বেশি সুযোগ থাকে?
বিজ্ঞান বিভাগে সবচেয়ে বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ের দরজা খোলা থাকে, কারণ পরে চাইলে কমার্স বা মানবিকের অনেক বিষয়েও বসা যায়। তবে “বেশি সুযোগ” মানেই “সবচেয়ে ভালো পছন্দ” না, বিষয়ের প্রতি আগ্রহটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কমার্স বা মানবিক থেকে কি ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিকেলে যাওয়া যায়?
না, সরাসরি না। ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় বসতে HSC-তে বিজ্ঞান বিভাগের নির্দিষ্ট বিষয়গুলো (পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত বা জীববিজ্ঞান) পড়া থাকা লাগে।
বাবা-মা এক বিভাগ চান, নিজের ইচ্ছা আরেকটা, কী করব?
প্রথমে নিজের যুক্তিগুলো গুছিয়ে খোলাখুলি কথা বলুন, শুধু “আমার ভালো লাগে না” না বলে কেন ভালো লাগে বা লাগে না সেটা ব্যাখ্যা করুন। শেষমেশ তিন বছর পড়াশোনাটা আপনাকেই করতে হবে, সেই বাস্তবতাটা আলোচনায় সামনে আনা জরুরি।
মানবিক বা কমার্স নিলে কি ক্যারিয়ারের সুযোগ কম?
না। ব্যাংকিং, আইন, সাংবাদিকতা, প্রশাসন, উদ্যোক্তা হওয়া, এই পথগুলোর প্রতিটাতেই ভালো ক্যারিয়ার গড়া যায়। সুযোগ কম না, সুযোগের ধরনটা আলাদা।
HSC শুরুর পর গ্রুপ বদলানো যায়?
অনেক প্রতিষ্ঠানে সীমিত সময়ের মধ্যে বদলানোর সুযোগ থাকে, তবে শর্ত ও প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা। ভর্তির আগেই সংশ্লিষ্ট কলেজে খোঁজ নিয়ে নেওয়া ভালো।
SSC-র পরের এই সিদ্ধান্তটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জীবনের একমাত্র সিদ্ধান্ত না। যে বিভাগেই যান, বিভাগ বদলে যাওয়ার ভয়ের চেয়ে বিষয়টা নিয়ে সত্যিকারের আগ্রহ ধরে রাখাটাই বেশি কাজে দেবে। GPA হিসাব করতে চাইলে আমাদের জিপিএ ক্যালকুলেটর আর নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের Subject Review সিরিজও দেখে নিতে পারেন।


মতামত (১)