কানাডার নিয়ম গত দুই বছরে যত দ্রুত বদলেছে, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তিও তত বেড়েছে। কেউ বলছেন PAL ছাড়া আবেদনই হবে না, কেউ বলছেন মাস্টার্সে লাগে না; ফান্ডসের অঙ্ক নিয়েও একেক জায়গায় একেক তথ্য। আমাদের কানাডায় উচ্চশিক্ষার মূল গাইডে পুরো প্রক্রিয়াটা ধাপে ধাপে লেখা আছে; এই লেখাটা সেটার পরিপূরক, যেখানে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞেস করা প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর দিলাম, ২০২৬-এর হালনাগাদ নিয়ম ধরে।
সূচিপত্র
Canada FAQ: PAL কাদের লাগে, কাদের লাগে না
PAL (Provincial Attestation Letter) বা TAL হলো প্রদেশের দেওয়া একটা চিঠি, যেটা প্রমাণ করে ওই প্রদেশের কোটার ভেতরে আপনার জায়গা আছে। ২০২৬-এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এখানেই:
- ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে পাবলিক DLI-তে মাস্টার্স ও ডক্টরাল প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের স্টাডি পারমিট আবেদনে PAL/TAL জমা দিতে হয় না
- প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পড়তে গেলে অ্যাটেস্টেশন লেটার এখনো লাগে
- ব্যাচেলর বা ডিপ্লোমা পর্যায়ের বেশিরভাগ আবেদনকারীর ক্ষেত্রেও PAL/TAL লাগে
এই এক পরিবর্তনেই মাস্টার্সে যেতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকটা সুবিধা হয়েছে, কারণ প্রদেশের কোটার অপেক্ষায় বসে থাকতে হচ্ছে না। তবে “পাবলিক DLI” শর্তটা খেয়াল রাখুন, প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের আগেই সেটা যাচাই করে নেওয়া দরকার।

প্রুফ অব ফান্ডস আর GIC
১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ বা তার পরে জমা দেওয়া আবেদনের জন্য কুইবেকের বাইরে একজন আবেদনকারীকে দেখাতে হয় CAD ২২,৮৯৫, যেটা প্রথম বছরের জীবনযাত্রার খরচ, টিউশন আর যাতায়াতের খরচ এর মধ্যে ধরা নেই। সঙ্গে পরিবারের সদস্য থাকলে অঙ্ক বাড়ে: দুইজনের জন্য CAD ২৮,৫০২, তিনজনের জন্য CAD ৩৫,০৪০।
ফান্ডস দেখানোর স্বীকৃত উপায় কয়েকটা: কানাডার অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের GIC (Guaranteed Investment Certificate), ব্যাংক স্টেটমেন্ট, শিক্ষাঋণের কাগজ, আর আগেই পরিশোধ করা টিউশন বা বাসস্থানের রসিদ। GIC এখনো সবচেয়ে পরিষ্কার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ টাকাটা কানাডার ব্যাংকেই আটকে থাকে আর পৌঁছানোর পর মাসে মাসে ফেরত পাওয়া যায়।
একটা ভুল ধারণা এখানে পরিষ্কার করা দরকার: SDS (Student Direct Stream) ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই “SDS-এ দ্রুত ভিসা” জাতীয় পরামর্শ এখন আর কার্যকর না, সবাইকেই সাধারণ স্ট্রিমে আবেদন করতে হয়।

ক্যাপ আর আবেদনের সময়
কানাডা ২০২৬ সালেও জাতীয় ক্যাপ চালু রেখেছে; এ বছর স্টাডি পারমিট আবেদনের জায়গা ধরা হয়েছে প্রায় ৩,০৯,৬৭০, আর নতুন-পুরোনো মিলিয়ে ইস্যু হতে পারে প্রায় ৪ লাখের মতো পারমিট। এর বাস্তব মানে হলো, জায়গা সীমিত, তাই দেরিতে আবেদন করলে ঝুঁকি বাড়ে।
বাস্তব পরামর্শ: ইনটেকের অন্তত ছয় থেকে আট মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করুন। ভর্তির অফার, PAL (যদি লাগে), GIC আর মেডিকেল, এই ধাপগুলো একটার পর একটা হয়, তাড়াহুড়োয় করা যায় না।
পড়ার সময় কাজ
স্টাডি পারমিটধারী পূর্ণকালীন শিক্ষার্থীরা ক্লাস চলাকালে ক্যাম্পাসের বাইরে সীমিত ঘণ্টা কাজ করতে পারেন, আর নির্ধারিত ছুটিতে পূর্ণকালীন। ঘণ্টার সীমা গত কয়েক বছরে একাধিকবার বদলেছে, তাই নিজের পারমিটের শর্ত আর IRCC-র অফিসিয়াল পাতা মিলিয়ে নেওয়াই একমাত্র নিরাপদ পথ।
একটা কথা খোলাখুলি বলা দরকার: পার্টটাইম কাজের আয় দিয়ে পুরো টিউশন চালানোর পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত না। কাজ খরচের কিছুটা সামলাতে সাহায্য করে, পুরোটা না।
PGWP আর তারপর
পড়া শেষে Post-Graduation Work Permit (PGWP) নিয়ে কানাডায় কাজের অভিজ্ঞতা নেওয়া যায়, আর সেই অভিজ্ঞতাই পরে Express Entry-র মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের (PR) পথ খোলে। তবে ২০২৪-২৫ থেকে দুটো শর্ত যুক্ত হয়েছে যা আগে ছিল না:
- ভাষার দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়
- নির্দিষ্ট কিছু প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে field of study শর্ত মানতে হয় (কোন কোন ক্ষেত্র যোগ্য, তালিকা IRCC নির্ধারণ করে); ডিগ্রি-লেভেলের কিছু প্রোগ্রামে এই শর্তে ছাড় আছে
এর মানে দাঁড়ায়: প্রোগ্রাম বাছাইয়ের সিদ্ধান্তটা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভর্তির আগেই দেখে নিন আপনার প্রোগ্রাম PGWP-র জন্য যোগ্য কি না; না দেখে ভর্তি হয়ে পরে আটকে যাওয়ার ঘটনা এখন অস্বাভাবিক না।
অন্য দেশের সাথে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে দেখুন আমাদের জার্মানি, যুক্তরাজ্য আর অস্ট্রেলিয়া গাইডগুলো; IELTS-এর প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আছে IELTS গাইডে।
আরও কিছু প্রশ্ন
ব্যাচেলরে যাব নাকি মাস্টার্সে?
২০২৬-এর নিয়ম মাস্টার্সকে তুলনামূলক সুবিধাজনক করেছে (পাবলিক DLI-তে PAL লাগছে না, সময় কম, খরচও কম)। বাংলাদেশে অনার্স শেষ করে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে সেটাই এখন বেশি যুক্তিসঙ্গত পথ।
স্পাউস নিয়ে যাওয়া যাবে?
স্পাউস ওপেন ওয়ার্ক পারমিটের নিয়ম সীমিত করা হয়েছে; মূলত নির্দিষ্ট স্তরের প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। আবেদনের আগে নিজের প্রোগ্রামের অবস্থা IRCC-তে যাচাই করে নিন।
IELTS ছাড়া কি আবেদন করা যায়?
কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প মানে (যেমন Duolingo বা মাধ্যমের সনদ) ভর্তি দেয়, কিন্তু ভিসা আর পরে PGWP-র ভাষা-শর্তের কথা ভেবে স্বীকৃত পরীক্ষা দিয়ে রাখাই নিরাপদ।
এজেন্সি ছাড়া নিজে আবেদন করা যায়?
যায়, এবং অনেকেই করেন। IRCC-র নিজস্ব পোর্টালেই পুরো আবেদন করা যায়; শুধু ডকুমেন্ট গোছানো আর সময়সীমা মানার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হয়।
টাকার অঙ্কগুলো কি প্রতি বছর বদলায়?
হ্যাঁ। প্রুফ অব ফান্ডসের অঙ্ক নিয়মিত হালনাগাদ হয়, আর ক্যাপের সংখ্যাও প্রতি বছর ঠিক হয়। আবেদনের ঠিক আগে IRCC-র পাতা থেকে সংখ্যাটা মিলিয়ে নেওয়া বাধ্যতামূলক ধরে নিন।

