সূচিপত্র
এক বছরে মাস্টার্স শেষ, বিশ্বের প্রথম সারির র্যাঙ্কিং, আর ডিগ্রির গায়ে এমন এক দেশের নাম যেটা চেনাতে হয় না, যুক্তরাজ্যের আকর্ষণের মূল সূত্র এটাই। কিন্তু গত দুই-তিন বছরে UK-র নিয়মের বইও দ্রুত বদলেছে: টানা মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা পরিবার নিতে পারেন না, পড়া-শেষের গ্র্যাজুয়েট রুটের মেয়াদ কমার তারিখ ঘোষণা হয়ে গেছে, আর খরচের খাতায় যোগ হয়েছে মোটা অঙ্কের হেলথ সারচার্জ।
Study Abroad সিরিজের এই কিস্তিতে UK-র হালনাগাদ পুরো ছবি: কার জন্য এই দেশ সেরা চুক্তি, কোন নিয়মগুলো নতুন, খরচ আসলে কত, আর শেভেনিংয়ের মতো স্কলারশিপে সুযোগটা কীভাবে নিতে হয়। সিরিজের সাধারণ প্রস্তুতি মূল গাইডে।
সংক্ষেপে যা জানা দরকার
- মাস্টার্স মাত্র ১ বছরের, মানে টিউশনের সাথে থাকা-খাওয়ার খরচও এক বছরের
- টানা (taught) মাস্টার্স ও ব্যাচেলরের শিক্ষার্থীরা স্বামী-স্ত্রী-সন্তান নিতে পারেন না; ব্যতিক্রম পিএইচডি-গবেষণা ও সরকারি-স্কলারশিপধারীরা
- পড়া-শেষে গ্র্যাজুয়েট রুট: এখন আবেদন করলে ২ বছর, ২০২৭-এর জানুয়ারি থেকে আবেদনকারীদের জন্য ১৮ মাস
- ভিসার সাথে দিতে হয় হেলথ সারচার্জ (IHS), বর্তমান হারে শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে £৭০০+
- ফান্ডসের নিয়ম কড়া: নির্ধারিত অঙ্ক টানা ২৮ দিন ব্যাংকে রাখার প্রমাণ
- পুরো খরচের স্কলারশিপ আছে: শেভেনিং (কাজের অভিজ্ঞতাসহ), কমনওয়েলথ
১ বছরের মাস্টার্স: UK-র আসল অস্ত্র
অন্য দেশে মাস্টার্স মানে দুই বছর, UK-তে এক। এই এক লাইনের পার্থক্যটা টাকায় রূপান্তর করলে দাঁড়ায়: এক বছরের কম টিউশন, এক বছরের কম বাসাভাড়া-খাওয়া, আর এক বছর আগে আয় শুরু। ক্যারিয়ারের মাঝপথে যাঁরা দ্রুত একটা আন্তর্জাতিক ডিগ্রি যোগ করতে চান, তাঁদের জন্য এর চেয়ে দক্ষ কাঠামো কমই আছে। সাথে যোগ করুন প্রতিষ্ঠানের গভীরতা: অক্সফোর্ড-কেমব্রিজের বাইরেও রাসেল গ্রুপের বড় নামগুলো, আর প্রায় প্রতিটা শহরে অন্তত একটা মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়।
উল্টো পিঠটাও জানা দরকার: এক বছরের কোর্স মানে দম ফেলার সময় নেই, সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে পরের সেপ্টেম্বরে ডিজারটেশন জমা। আর পার্টটাইম কাজের সীমিত ঘণ্টায় (টার্ম চলাকালীন সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা) খরচের বড় অংশ তোলা কঠিন, তাই টাকার পরিকল্পনাটা যাওয়ার আগেই পাকা হওয়া চাই।
নতুন নিয়ম: ডিপেন্ড্যান্ট, গ্র্যাজুয়েট রুট ও সময়ের হিসাব

- ডিপেন্ড্যান্ট নিষেধাজ্ঞা: ২০২৪ থেকে টানা মাস্টার্স ও ব্যাচেলরের শিক্ষার্থীরা স্টুডেন্ট ভিসায় পরিবার (স্বামী-স্ত্রী, সন্তান) নিতে পারেন না। ব্যতিক্রম: পিএইচডি-গবেষণা প্রোগ্রাম আর সরকারি-স্কলারশিপধারীরা। “ফ্যামিলিসহ UK” প্যাকেজ বেচা এজেন্ট মানেই পুরোনো বা মিথ্যা তথ্য।
- গ্র্যাজুয়েট রুটের ঘড়ি: পড়া-শেষে কাজ খোঁজার এই ভিসা এখনো ২ বছরের (পিএইচডিতে বেশি), কিন্তু ঘোষণা অনুযায়ী ২০২৭-এর ১ জানুয়ারি বা তার পরের আবেদনে মেয়াদ ১৮ মাস। মানে সামনের ইনটেকগুলোর হিসাবে এই তারিখটা মাথায় রাখুন; সুখবর হলো এই রুটে আলাদা ব্যাংক-ব্যালেন্স দেখাতে হয় না।
- eVisa যুগ: আগের BRP কার্ডের জায়গা নিয়েছে ডিজিটাল eVisa, ভিসা পাওয়ার পর UKVI অ্যাকাউন্টেই সব।
- কড়া যাচাই: CAS-এর তথ্য, টাকার উৎস আর “ক্রেডিবিলিটি ইন্টারভিউ”, তিন জায়গাতেই অসংগতি মানে প্রত্যাখ্যান। সাজানো কাগজের ঝুঁকি এখানে সবচেয়ে বেশি।
খরচ: টিউশন, IHS আর ফান্ডসের নিয়ম
- টিউশন: মাস্টার্সে মোটা দাগে £১৪-২৫ হাজার, নামী প্রোগ্রাম-বিজনেস স্কুলে আরও বেশি। ভালো খবর: অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ২-৫ হাজার পাউন্ডের স্বয়ংক্রিয় স্কলারশিপ দেয়।
- IHS (হেলথ সারচার্জ): ভিসার আবেদনেই পুরো মেয়াদের সারচার্জ দিতে হয়, বর্তমান হারে শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে £৭০০+ (গ্র্যাজুয়েট রুটে গেলে সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক হার, £১,০০০+)। বিনিময়ে NHS-এর চিকিৎসা কার্যত ফ্রি।
- মেইনটেন্যান্স ফান্ডস: লন্ডনে পড়লে বেশি, বাইরে কম, নির্ধারিত মাসিক অঙ্ক (সর্বোচ্চ ৯ মাসের হিসাবে) টানা ২৮ দিন ব্যাংকে রাখার প্রমাণ লাগে। অঙ্কগুলো নিয়মিত সংশোধন হয়, তাই চূড়ান্ত সংখ্যা সবসময় gov.uk-র স্টুডেন্ট ভিসা পেজে দেখে নেবেন। ২৮ দিনের নিয়ম ভেঙে “শেষ মুহূর্তে টাকা ঢুকিয়ে” আবেদন করা প্রত্যাখ্যানের সবচেয়ে কমন কারণগুলোর একটা।
- ভিসা ফি ও আনুষঙ্গিক: আবেদন ফি, TB টেস্ট, ইংরেজি পরীক্ষার খরচ, সব মিলিয়ে আবেদন-পর্বেই লাখ টাকার ঘরের প্রস্তুতি।
আবেদনের ধাপ: অফার থেকে eVisa পর্যন্ত

- প্রোগ্রাম ও অফার: মাস্টার্সে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোর্টালে আবেদন (ব্যাচেলরে UCAS-এর মাধ্যমে), শর্তে সাধারণত IELTS 6.0-6.5+, প্রস্তুতি IELTS গাইডে। ভিসার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে UKVI-সংস্করণের IELTS লাগে, প্রোগ্রাম আর gov.uk দুটোতেই মিলিয়ে নিন।
- ডিপোজিট ও CAS: অফার গ্রহণ করে ডিপোজিট দিলে বিশ্ববিদ্যালয় ইস্যু করে CAS (ভর্তির ইলেকট্রনিক সনদ), ভিসার আবেদন এই নম্বর ধরেই।
- ফান্ডস গোছানো: টিউশনের বাকি + মেইনটেন্যান্সের অঙ্ক ২৮ দিন টানা ব্যাংকে, স্টেটমেন্ট-সার্টিফিকেট প্রস্তুত।
- ভিসার আবেদন: অনলাইনে ফরম + IHS পরিশোধ + বায়োমেট্রিক্স (ঢাকার VFS), প্রয়োজনে ক্রেডিবিলিটি ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি: নিজের কোর্স, ফান্ডিং আর পরিকল্পনা নিজের ভাষায় বলতে পারা।
- eVisa ও উড়াল: অনুমোদনের পর UKVI অ্যাকাউন্টে eVisa, তারপর টিকিট-আবাসন, ক্লাস শুরু সাধারণত সেপ্টেম্বরে (জানুয়ারি ইনটেকও অনেক প্রোগ্রামে আছে)।
শেভেনিং, কমনওয়েলথ ও বাকি স্কলারশিপ
- শেভেনিং (Chevening): UK সরকারের ফ্ল্যাগশিপ, ১ বছরের মাস্টার্সের পুরো খরচ (টিউশন-ভাতা-টিকিট)। শর্তের মূল কথা: মোটামুটি দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা আর নেতৃত্বের প্রমাণ, মানে এটা ফ্রেশারদের না, ক্যারিয়ার-শুরু-করা মানুষদের স্কলারশিপ। আবেদন খোলে আগস্ট-নভেম্বরে, তথ্য chevening.org-এ।
- কমনওয়েলথ স্কলারশিপ: উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট মাস্টার্সে পুরো ফান্ডিং, বাংলাদেশিদের দীর্ঘ সাফল্যের রেকর্ড আছে।
- বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব: GREAT স্কলারশিপ, ভাইস-চ্যান্সেলর/ইন্টারন্যাশনাল স্কলারশিপ, অনেকগুলো আবেদনের সাথেই স্বয়ংক্রিয় বিবেচনায়।
- গবেষণায়: পিএইচডিতে ফান্ডেড পজিশন আর ডক্টরাল প্রোগ্রামের স্টাইপেন্ড, সাথে পরিবারের নিয়মেও ছাড় (গবেষণা-শিক্ষার্থীরা ডিপেন্ড্যান্ট নিতে পারেন)।
UK-স্পেশাল এজেন্ট-ফাঁদ
- “ফ্যামিলিসহ যান”: টানা মাস্টার্সে এটা এখন নিয়মেই নিষিদ্ধ, যে বলছে সে হয় জানে না, নয় ঠকাচ্ছে।
- “কাজ করে টিউশন তুলবেন”: সপ্তাহে ২০ ঘণ্টার সীমায় লন্ডনের খরচ চালানোই কঠিন, টিউশন তোলা অবাস্তব। UK-র হিসাব আগে থেকেই পুরো টাকার হিসাব।
- নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অফার: ডিগ্রির মান আর গ্র্যাজুয়েট রুট-পরবর্তী চাকরির বাজার, দুটোই প্রতিষ্ঠানের ওজনের ওপর দাঁড়িয়ে। র্যাঙ্কিং-স্বীকৃতি নিজে যাচাই করুন।
- ২৮-দিনের নিয়মের “ব্যবস্থা”: ধার-করা টাকা ঘুরিয়ে দেখানোর প্রস্তাব মানে জালিয়াতি, ধরা পড়লে ভবিষ্যতের দরজাও বন্ধ। বাকি লাল পতাকা মূল গাইডে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
গ্র্যাজুয়েট রুট কমে যাচ্ছে মানে কি UK আর ভালো অপশন না?
১৮ মাসও কাজ খোঁজার জন্য যথেষ্ট সময়, আর স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় উঠতে পারলে মেয়াদের প্রশ্নটাই মিটে যায়। তবে হ্যাঁ, ২ বছরের সুবিধা নিতে চাইলে ২০২৬-এর ইনটেকগুলোই শেষ সুযোগের দিকে, পরিকল্পনা সেভাবে সাজান।
IELTS-এর বদলে অন্য কিছু চলে?
বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে TOEFL, PTE, এমনকি নিজস্ব ইংরেজি-যাচাই চলে; তবে ভিসার নির্দিষ্ট কিছু রুটে অনুমোদিত (UKVI) টেস্ট লাগে। নিরাপদ পথ: IELTS একটা ভালো স্কোর, যেটা সব দরজায় চলে।
লন্ডন নাকি লন্ডনের বাইরে?
লন্ডনে সুযোগ আর নেটওয়ার্ক বেশি, খরচও; বাইরের শহরে (ম্যানচেস্টার, গ্লাসগো, বার্মিংহাম, শেফিল্ড) একই মানের ডিগ্রি অনেক কম জীবনযাত্রার খরচে। বাজেট টানাটানির হলে বাইরের রাসেল গ্রুপই সেরা ভারসাম্য।
জানুয়ারি ইনটেক কি সেপ্টেম্বরের মতোই?
অনেক প্রোগ্রামে জানুয়ারি ইনটেক আছে, মানে সেপ্টেম্বর মিস হলে এক বছর বসে থাকতে হয় না। তবে প্রোগ্রামের বাছাই-তালিকা জানুয়ারিতে ছোট, আগে নিশ্চিত হোন আপনার বিষয়টা আছে কি না।
শেভেনিংয়ের জন্য কি এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া যায়?
যায় এবং উচিত: দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতার হিসাব, নেতৃত্বের গল্পগুলো গুছিয়ে রাখা, আর চারটা এসের (essay) খসড়া, এগুলো আগেভাগে শুরু করাই সাফল্যের প্যাটার্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতেই ক্লাব-সংগঠনে নেতৃত্বের ট্র্যাক গড়ুন, রেজাল্টের হিসাব রাখুন সিজিপিএ ক্যালকুলেটরে।
জার্মানি-কানাডার সাথে তুলনায় UK কার জন্য?
দ্রুত ডিগ্রি + ব্র্যান্ড চাইলে UK; টিউশন-ফ্রি চাইলে জার্মানি; ইমিগ্রেশন-কাঠামো চাইলে কানাডা; পুরো সরকারি খরচে পড়তে জাপানের MEXT। নিজের অগ্রাধিকারই সিদ্ধান্ত।

