সূচিপত্র
বিদেশে পড়া, চাকরি বা ইমিগ্রেশন, পরিকল্পনা যেটাই হোক, কোথাও না কোথাও গিয়ে একটা প্রশ্নে থামতে হয়: “IELTS স্কোর কত?” অথচ পরীক্ষাটা নিয়ে বাজারে যত কথা চালু, তার বড় অংশই হয় আধা-সত্য নয়তো কোচিংয়ের বিজ্ঞাপন। কেউ বলে “ইংরেজিতে ভালো হলে এমনিই ৮ আসবে”, কেউ ভয় দেখায় “কোচিং ছাড়া অসম্ভব”, দুটোই ভুল।
এই লেখাটা আমাদের IELTS সিরিজের ভিত্তি-গাইড: পরীক্ষাটা আসলে কী মাপে, কাঠামো কেমন, বাংলাদেশে ফি ও রেজিস্ট্রেশনের হালনাগাদ চিত্র, আর ঘরে বসে গোছানো প্রস্তুতির একটা বাস্তব রোডম্যাপ।
সংক্ষেপে যা জানা দরকার
- IELTS মাপে চারটা দক্ষতা: Listening, Reading, Writing, Speaking, প্রতিটায় ব্যান্ড ০-৯, সাথে একটা সামগ্রিক (Overall) ব্যান্ড
- দুই সংস্করণ: বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে Academic, ইমিগ্রেশন-কাজের জন্য সাধারণত General Training
- বাংলাদেশে পরীক্ষা নেয় ব্রিটিশ কাউন্সিল ও IDP, কম্পিউটার-ডেলিভারড টেস্টের ফি এখন ২৫ হাজার টাকার আশেপাশে
- ফল: কম্পিউটারে ৩-৫ দিনে, পেপারে প্রায় ১৩ দিনে; স্কোরের মেয়াদ ২ বছর
- বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাওয়া Overall 6.0-6.5, প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে 7.0+
- নতুন সুবিধা: এক স্কিলে কম পেলে পুরো পরীক্ষা নয়, শুধু সেই স্কিলটা আবার দেওয়া যায় (One Skill Retake)
IELTS আসলে কী, আর কার জন্য
IELTS (International English Language Testing System) পৃথিবীর সবচেয়ে বহুল স্বীকৃত ইংরেজি দক্ষতার পরীক্ষা, হাজারো বিশ্ববিদ্যালয়, নিয়োগদাতা আর কয়েকটা দেশের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এটা গ্রহণ করে। মূল কথাটা পরিষ্কার থাকা দরকার: এটা সাহিত্যের বা গ্রামারের পরীক্ষা না, যোগাযোগের পরীক্ষা, আপনি ইংরেজিতে শুনে-পড়ে-লিখে-বলে কাজ চালাতে পারেন কি না, সেটার মাপ।
সংস্করণ বাছাইটা প্রথম সিদ্ধান্ত: বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য লাগবে Academic, আর কানাডা-অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে স্থায়ী হওয়া বা কাজের ভিসার অনেক ক্ষেত্রে General Training। যুক্তরাজ্যের ভিসার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে লাগে আলাদা সংস্করণ (IELTS for UKVI, Life Skills), আবেদনের আগে গন্তব্য প্রতিষ্ঠান-দূতাবাসের চাহিদা মিলিয়ে নেওয়াই নিয়ম। ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনাই যাঁদের পরিকল্পনা, তাঁদের জন্য আমাদের ইংরেজি সাবজেক্ট রিভিউতে সাহিত্য-ELT-র পুরো জগৎটা আলাদা করে দেখানো আছে (আর সেখানে এই ভুল ধারণাটাও ভাঙা আছে যে ইংরেজিতে অনার্স মানেই IELTS-এ ৮)।
চার মডিউলের কাঠামো

- Listening (~৩০ মিনিট, ৪০ প্রশ্ন): কথোপকথন আর লেকচার শুনে উত্তর, রেকর্ডিং বাজে মাত্র একবার
- Reading (৬০ মিনিট, ৪০ প্রশ্ন): Academic-এ জার্নাল-ম্যাগাজিন ঘরানার তিনটা প্যাসেজ, GT-তে দৈনন্দিন ঘরানার টেক্সট
- Writing (৬০ মিনিট, ২ টাস্ক): Academic-এ Task 1 গ্রাফ-চার্ট বর্ণনা, Task 2 আর্গুমেন্ট এসে (দুই সংস্করণেই); Task 2-র ওজন দ্বিগুণ
- Speaking (১১-১৪ মিনিট): পরীক্ষকের সাথে মুখোমুখি (বা ভিডিও) তিন পর্বের কথোপকথন: পরিচিতি, একটা টপিকে ২ মিনিট বলা, তারপর গভীর আলোচনা
কম্পিউটার নাকি পেপার?
কনটেন্ট, প্রশ্ন আর কাঠিন্য দুটোতেই এক, পার্থক্য অভিজ্ঞতায়। কম্পিউটার-ডেলিভারড টেস্টে ফল আসে ৩-৫ দিনে (পেপারে প্রায় ১৩ দিন), টাইপ করে লেখা যায় (হাতের লেখা খারাপ হলে আশীর্বাদ), আর তারিখের অপশনও বেশি। পেপার ভালো লাগে তাঁদের, যাঁরা কাগজে দাগিয়ে-আন্ডারলাইন করে পড়তে অভ্যস্ত। আরেকটা বড় পয়েন্ট: One Skill Retake সুবিধাটা কম্পিউটার-ডেলিভারড টেস্টেই মেলে, তাই সংশয়ে থাকলে কম্পিউটার সংস্করণই এখন নিরাপদ ডিফল্ট।
বাংলাদেশে ফি ও রেজিস্ট্রেশন
বাংলাদেশে IELTS নেয় দুটো প্রতিষ্ঠান: ব্রিটিশ কাউন্সিল আর IDP, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে দুটোরই সেন্টার আছে। হালনাগাদ (২০২৬) ফির চিত্রটা মোটামুটি এরকম:
- কম্পিউটার-ডেলিভারড Academic/GT: ২৫ হাজার টাকার আশেপাশে
- IELTS for UKVI: ২৭ হাজারের ঘরে
- Life Skills: ২১ হাজারের কাছাকাছি
- One Skill Retake: পুরো ফির চেয়ে বেশ কম, মোটামুটি ১৪-১৯ হাজারের সীমায়
সংখ্যাগুলো “আশেপাশে” বলার কারণ আছে: ফি ডলারের বিনিময় হারের সাথে মাঝেমধ্যেই সংশোধন হয়, তাই বুকিংয়ের দিন অফিসিয়াল সাইটের অঙ্কটাই চূড়ান্ত ধরবেন। রেজিস্ট্রেশন পুরোটাই অনলাইনে, পেমেন্ট করা যায় কার্ড, বিকাশ-নগদসহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। পরীক্ষার তারিখ মেলে প্রায় সারা বছরই, তবে ভরা মৌসুমে (সেপ্টেম্বর-জানুয়ারি) পছন্দের স্লট আগে বুক করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ব্যান্ড স্কোর: কত পেলে কী হয়

প্রতিটা স্কিলে ব্যান্ড আসে ০ থেকে ৯-এ, হাফ-ব্যান্ডসহ (6.5, 7.5), আর Overall হলো চারটার গড়, কাছের হাফ-ব্যান্ডে রাউন্ড করা। চাহিদার বাস্তব চিত্র:
- 6.0-6.5: বেশিরভাগ দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স-ব্যাচেলরের সাধারণ চাওয়া, অনেক ক্ষেত্রে সাথে “কোনো স্কিলে 5.5/6.0-এর নিচে না” শর্ত
- 7.0+: শীর্ষ র্যাঙ্কের প্রোগ্রাম, আইন-মেডিসিন-নার্সিংয়ের মতো পেশাগত নিবন্ধন, আর শিক্ষকতা-স্কলারশিপের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার স্কোর
- 5.5-6.0: ফাউন্ডেশন-পাথওয়ে প্রোগ্রাম বা কিছু দেশের কলেজ-পর্যায়ের অপশন খোলা থাকে
মনে রাখবেন, “ভালো ব্যান্ড” বলে কোনো ইউনিভার্সাল সংখ্যা নেই, লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানের চাহিদাই আপনার টার্গেট। কোথায় কত লাগে সেই গবেষণাটা কীভাবে করবেন, ধাপে ধাপে আছে আমাদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার গাইডে।
৮-১২ সপ্তাহের প্রস্তুতির রোডম্যাপ
- সপ্তাহ ১: নিজের অবস্থান মাপুন। একটা পূর্ণাঙ্গ মক টেস্ট দিন (অফিসিয়াল স্যাম্পল বা কেমব্রিজের বিগত প্রশ্নের বই থেকে), টাইমারসহ। এই “ডায়াগনোসিস”-ই ঠিক করবে কোন স্কিলে কত সময় ঢালবেন।
- সপ্তাহ ২-৮: স্কিলভিত্তিক রুটিন। প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট ইংরেজি শোনা (পডকাস্ট, ডকুমেন্টারি) আর পড়া (মানসম্পন্ন আর্টিকেল), এটা Listening-Reading দুটোই টেনে তোলে। Writing-এ সপ্তাহে অন্তত দুটো Task 2 এসে লিখে কারও ফিডব্যাক নিন, নিজে নিজে লিখে গেলে একই ভুল জমাট বাঁধে। Speaking-এ প্রতিদিন নিজের উত্তর রেকর্ড করে শুনুন, পার্টনার পেলে আরও ভালো।
- শেষ ২-৩ সপ্তাহ: পরীক্ষার কন্ডিশনে মক। সপ্তাহে ১-২টা পূর্ণ মক, ভুলের প্যাটার্ন খাতায় টুকে সেগুলোই মেরামত। কম্পিউটারে পরীক্ষা দিলে মকগুলোও স্ক্রিনে দেওয়ার অভ্যাস করুন।
কোচিং লাগবে কি না, সৎ উত্তর: বাধ্যতামূলক না। গোছানো self-study-তে লাখো মানুষ ভালো ব্যান্ড পান; কোচিং কাজে দেয় তাঁদের, যাঁদের রুটিনের বাইরের চাপ দরকার বা Writing-Speaking-এ নিয়মিত ফিডব্যাক দেওয়ার কেউ নেই।
যে ভুলগুলো ব্যান্ড কমিয়ে দেয়
- মুখস্থ উত্তর: Speaking-Writing-এ মুখস্থ টেমপ্লেট পরীক্ষকেরা চিনে ফেলেন, স্কোর বাড়ার বদলে কমে
- শব্দসংখ্যা অবহেলা: Writing-এ নির্ধারিত শব্দের কম লিখলে সরাসরি পেনাল্টি
- Listening-এ পিছিয়ে পড়া: এক প্রশ্ন মিস করে সেখানেই আটকে থাকলে পরের তিনটাও যায়, মিস করলে সাথে সাথে সামনে তাকান
- “ইংরেজি তো পারিই” আত্মবিশ্বাস: ফরম্যাট না জেনে পরীক্ষায় বসা ব্যান্ড খোয়ানোর সবচেয়ে দামি উপায়, অন্তত ফরম্যাটটা মুখস্থ রাখুন
- এক স্কিল পুরো উপেক্ষা: Overall ভালো হলেও এক স্কিলের নিচু স্কোরে অনেক অফার আটকে যায়, দুর্বলতম স্কিলটাই বেশি সময় পাওয়ার দাবিদার
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রস্তুতিতে কত দিন লাগে?
বর্তমান দক্ষতা আর টার্গেট ব্যান্ডের দূরত্বের ওপর নির্ভর করে। মোটা দাগে আধা থেকে এক ব্যান্ড তুলতে ৮-১২ সপ্তাহের নিয়মিত চর্চা একটা বাস্তব হিসাব; এক লাফে দেড়-দুই ব্যান্ড তোলার প্রতিশ্রুতি যে-ই দিক, সন্দেহ করুন।
One Skill Retake কীভাবে কাজ করে?
মূল পরীক্ষার ৬০ দিনের মধ্যে যেকোনো একটা স্কিল আবার দেওয়া যায় (কম্পিউটার-ডেলিভারড টেস্টে), বাকি তিনটার স্কোর আগেরটাই থাকে, আর নতুন একটা পূর্ণাঙ্গ স্কোর-রিপোর্ট পান। এক স্কিলে অল্পের জন্য টার্গেট মিস হলে এটা পুরো পরীক্ষার খরচ আর ধকল দুটোই বাঁচায়। যে প্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন তারা OSR-এর রিপোর্ট নেয় কি না, একবার মিলিয়ে নেবেন।
IELTS নাকি TOEFL নাকি Duolingo?
তিনটাই ইংরেজি দক্ষতার পরীক্ষা, গ্রহণযোগ্যতাই আসল পার্থক্য: IELTS-এর স্বীকৃতি সবচেয়ে চওড়া (UK-অস্ট্রেলিয়া-কানাডাসহ), TOEFL যুক্তরাষ্ট্রে সমান শক্তিশালী, আর Duolingo সস্তা-ঘরে-বসা বিকল্প হলেও সব প্রতিষ্ঠান আর ভিসা কর্তৃপক্ষ নেয় না। আগে টার্গেট প্রতিষ্ঠানের তালিকা, তারপর পরীক্ষা বাছাই।
স্কোর কত দিন বৈধ থাকে?
২ বছর। তাই খুব আগেভাগে পরীক্ষা দিয়ে ফেললে আবেদনের সময় মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে, ভর্তি-টাইমলাইনের সাথে মিলিয়ে পরীক্ষার তারিখ ফেলুন। টাইমলাইনটা কীভাবে সাজাবেন, দেখুন Study Abroad গাইডে।
কোন সেন্টারে পরীক্ষা দেওয়া ভালো, ব্রিটিশ কাউন্সিল না IDP?
পরীক্ষা, প্রশ্নের মান আর স্কোরিং দুটোতেই এক, IELTS-এর মালিকানাই যৌথ। বাছাই করুন সুবিধা দেখে: কোন সেন্টার কাছে, কোন তারিখ ফাঁকা, কার সার্ভিস অভিজ্ঞতা ভালো শুনেছেন।
HSC-র পরপরই কি IELTS দিয়ে রাখা উচিত?
ব্যাচেলর পর্যায়ে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে হ্যাঁ, HSC-র পরের ফাঁকা সময়টা প্রস্তুতির জন্য সোনার সময়। তবে ২ বছরের মেয়াদ মাথায় রেখে আবেদনের টাইমলাইনের সাথে মিলিয়ে নিন। পড়াশোনার হিসাব-নিকাশের বাকি টুলগুলো পাবেন আমাদের টুলস পেজে।


মতামত (১)