সূচিপত্র
ভর্তি মৌসুমে রসায়নের জায়গাটা একটু অদ্ভুত: মেডিকেল-বুয়েটের স্বপ্ন যাঁদের অল্পের জন্য হাতছাড়া, তাঁদের অনেকে “আপাতত রসায়নে ভর্তি হয়ে যাই” বলে ঢোকেন, তারপর আবিষ্কার করেন বিষয়টার নিজেরই একটা শক্ত সাম্রাজ্য আছে। দেশের ওষুধ কারখানার ল্যাব, গার্মেন্টসের ডাইং ইউনিট, খাদ্য পরীক্ষার গবেষণাগার, সবখানে যে মানুষগুলো কাজ করেন, তাঁদের বড় অংশের ডিগ্রিটা রসায়নে।
Subject Review সিরিজের এই কিস্তি, a chemistry subject review in Bangla, যেখানে সিলেবাস থেকে চাকরির বাজার, পুরো ছবিটা খোলামেলা।
রসায়ন সাবজেক্ট রিভিউ (Chemistry Subject Review): সংক্ষেপে
- পড়ার বিষয়: ভৌত, জৈব, অজৈব আর বিশ্লেষণী রসায়ন, প্রচুর ল্যাবসহ
- কোথায়: প্রায় প্রতিটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ
- চাকরির বড় ক্ষেত্র: ওষুধ শিল্পের QC-QA-R&D, টেক্সটাইলের ডাইজ-কেমিক্যাল, খাদ্য ও কনজিউমার পণ্য, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষকতা
- বাস্তবতা: ভালো পজিশনের জন্য মাস্টার্স প্রায় স্ট্যান্ডার্ড, শুধু অনার্সে থামলে বাজার ছোট
- সবচেয়ে বড় শক্তি: বিদেশে ফান্ডেড এমএসসি-পিএইচডির দরজা রসায়নে অনেক চওড়া
ওষুধ থেকে কাপড়ের রঙ: রসায়ন কোথায় নেই?
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প একটা নীরব সাফল্যের গল্প: দেশের চাহিদার প্রায় পুরোটা এখন দেশেই তৈরি হয়, রপ্তানিও হচ্ছে বিশ্বের বহু দেশে। স্কয়ার, ইনসেপ্টা, বেক্সিমকো, রেনাটার মতো কোম্পানিগুলোর প্রতিটা ব্যাচের ওষুধ বাজারে যাওয়ার আগে যে ল্যাবে পরীক্ষা হয়, সেখানকার কেমিস্টদের বড় অংশ রসায়নেরই গ্র্যাজুয়েট। ওষুধের বাইরে তাকালে টেক্সটাইলের ওয়েট প্রসেসিং (রঙ-কেমিক্যালের পুরো জগৎটা রসায়ন, বিস্তারিত আমাদের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং রিভিউতে), খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রসাধনী, সার-কীটনাশক, প্লাস্টিক-পলিমার, সিমেন্ট, সবগুলো শিল্পের মান নিয়ন্ত্রণ দাঁড়িয়ে আছে রসায়নের ওপর।
মানে বিষয়টা পড়ে “কী করব” প্রশ্নের উত্তর একটামাত্র শিল্পের ভাগ্যের ওপর ঝুলে নেই, এটাই রসায়নের নিরাপত্তা।
রসায়নে আসলে কী পড়ানো হয়?
অনার্সের চার বছরে গোটা বিষয়টা চারটা মূল শাখায় ভাগ হয়ে আসে:

- ভৌত রসায়ন: থার্মোডাইনামিক্স, কাইনেটিক্স, কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি, রসায়নের গণিত-ঘেঁষা দিক
- জৈব রসায়ন: কার্বন-যৌগের বিশাল জগৎ, ওষুধ শিল্পের ভিত্তি, মুখস্থ না বুঝে পড়লে সবচেয়ে আনন্দের অংশ
- অজৈব রসায়ন: ধাতু, খনিজ, কো-অর্ডিনেশন কেমিস্ট্রি
- বিশ্লেষণী রসায়ন: কোন নমুনায় কী আছে কতটুকু আছে বের করার বিদ্যা, ইন্ডাস্ট্রির QC ল্যাবের প্রাণ, স্পেকট্রোস্কোপি-ক্রোমাটোগ্রাফির যন্ত্রপাতিসহ
আর আছে ল্যাব, প্রতি সপ্তাহে, প্রতি বর্ষে। টাইট্রেশনের হিসাব না মেলা বিকেল আর অজানা নমুনা শনাক্তের চ্যালেঞ্জ, এগুলোই রসায়ন পড়ার আসল স্মৃতি হয়ে থাকে। হাতের কাজ যাঁদের ভালো লাগে না, এই বিষয় তাঁদের ক্লান্ত করবে।
কোথায় পড়া যায়?
রসায়ন এতটাই মৌলিক বিষয় যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের প্রায় প্রতিটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদে বিভাগটা আছে, ভর্তি হয় বিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষায়। বুয়েটসহ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও রসায়ন বিভাগ আছে, যদিও সেখানে মূল পরিচয় সার্ভিস-বিভাগ হিসেবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় কলেজগুলোতে রসায়নে অনার্স-মাস্টার্স দুটোই চালু, আর সেখানকার গ্র্যাজুয়েটরাও ইন্ডাস্ট্রি আর শিক্ষকতায় নিয়মিত জায়গা করে নিচ্ছেন।
ভর্তির যোগ্যতার হিসাবটা আগে মিলিয়ে নিতে জিপিএ ক্যালকুলেটর কাজে লাগবে, আর রেজাল্ট থেকে ভর্তি পর্যন্ত পুরো টাইমলাইন আছে HSC Result দেখার নিয়ম গাইডে।
ক্যারিয়ার: ফার্মা, টেক্সটাইল, গবেষণা ও আরও

- ওষুধ শিল্প: সবচেয়ে বড় নিয়োগদাতা। কোয়ালিটি কন্ট্রোল (QC), কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স (QA), প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, ভ্যালিডেশন। ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েটদের সাথে প্রতিযোগিতা হয় ঠিকই (দুই বিষয়ের তুলনা দেখুন ফার্মেসি রিভিউতে), তবে ল্যাব-পদগুলোতে কেমিস্টদের চাহিদা নিজস্ব।
- টেক্সটাইল ও ডাইজ-কেমিক্যাল: ডাইং-ফিনিশিংয়ের ল্যাব, কেমিক্যাল সাপ্লায়ার কোম্পানির টেকনিক্যাল সার্ভিস ও সেলস, বিদেশি ব্র্যান্ডের টেস্টিং ল্যাব।
- খাদ্য ও কনজিউমার পণ্য: ফুড কোম্পানির ল্যাব, কসমেটিকস, পেইন্ট, সিমেন্টসহ ম্যানুফ্যাকচারিং খাত।
- গবেষণা প্রতিষ্ঠান: BCSIR (বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ), পরমাণু শক্তি কমিশন, BSTI-র মতো মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে।
- শিক্ষকতা: স্কুল-কলেজে রসায়নের শিক্ষকের চাহিদা বরাবরই বেশি, সাথে বিশ্ববিদ্যালয় আর কোচিংয়ের বাজার।
- বিসিএস ও সরকারি চাকরি: সাধারণ ও শিক্ষা ক্যাডার, ওষুধ প্রশাসন, কাস্টমসের ল্যাব, ফরেনসিক।
সৎ কথাটা হলো: শুধু অনার্স ডিগ্রি হাতে ইন্ডাস্ট্রির দরজায় গেলে শুরুর বেতন মাঝারি, ১৫-২৫ হাজারের ঘরে শুরু হওয়া অস্বাভাবিক না, আর ভালো পদের জন্য মাস্টার্স কার্যত স্ট্যান্ডার্ড। অভিজ্ঞতা জমলে QC ম্যানেজার, R&D লিড পর্যায়ে ছবিটা অনেক ভদ্র। রসায়নে বড়লোক হওয়ার শর্টকাট নেই, কিন্তু বেকার থাকার ভয়ও তুলনামূলক কম।
উচ্চশিক্ষা: রসায়নের সবচেয়ে বড় শক্তি
যে জায়গায় রসায়ন প্রায় সব বিষয়কে পেছনে ফেলে, সেটা বিদেশে উচ্চশিক্ষা। আমেরিকা-কানাডা-জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেমিস্ট্রির পিএইচডি প্রোগ্রামগুলো সাধারণত পুরো ফান্ডিংসহ (টিউশন মওকুফ + মাসিক স্টাইপেন্ড) চলে, কারণ ল্যাবগুলোর গবেষণা-সহকারী দরকার হয়ই। ভালো সিজিপিএ, ল্যাব-অভিজ্ঞতা আর একটা-দুটো পাবলিকেশন থাকলে বাংলাদেশি রসায়ন গ্র্যাজুয়েটদের ফান্ডেড অফার পাওয়ার রেকর্ড চমৎকার। গবেষণার আলোচিত ক্ষেত্রগুলোও এখন জমজমাট: গ্রিন কেমিস্ট্রি, ন্যানোমেটেরিয়ালস, ব্যাটারি-এনার্জি স্টোরেজ, মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি।
এই পথের প্রথম ফিল্টার সিজিপিএ, তাই প্রথম বর্ষ থেকেই হিসাব রাখুন, সিজিপিএ ক্যালকুলেটর আছে সেজন্যই।
কাদের জন্য রসায়ন, কাদের জন্য না
রসায়ন তাঁদের জন্য, যাঁরা HSC-তে জৈব যৌগের বিক্রিয়াগুলো কষতে ভালোবাসতেন, ল্যাবের কাজে ধৈর্য আছে, আর ক্যারিয়ারের জন্য মাস্টার্স-পিএইচডি পর্যন্ত দৌড়ানোর মানসিক প্রস্তুতি রাখেন। গবেষক বা ইন্ডাস্ট্রি-বিজ্ঞানী হওয়ার যে স্বপ্নটা মেডিকেল-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভিড়ে চাপা পড়ে যায়, রসায়ন সেটার সবচেয়ে বাস্তব রাস্তাগুলোর একটা।
আর যাঁরা চার বছরেই মোটা বেতনের চাকরিতে ঢুকতে চান, ল্যাবের গন্ধ সহ্য হয় না, কিংবা মুখস্থনির্ভর পড়া ভাবছেন (ভুল ধারণা, রসায়ন আসলে যুক্তির বিষয়), তাঁদের জন্য এটা প্রথম পছন্দ না-ও হতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
রসায়ন নাকি ফলিত রসায়ন (Applied Chemistry), কোনটা ভালো?
ঢাবিসহ কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল (ACCE) আলাদা বিভাগ, সেখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রসেসের দিকে ঝোঁক বেশি। ইন্ডাস্ট্রি টার্গেট হলে ফলিত দিকটা সামান্য এগিয়ে, গবেষণা-উচ্চশিক্ষায় দুটোই সমান চলে। মৌলিক পার্থক্য যতটা ভাবা হয় ততটা বড় না।
রসায়ন পড়ে কি ফার্মা কোম্পানিতে চাকরি নিশ্চিত?
নিশ্চিত বলে কিছু নেই, তবে সম্ভাবনা ভালো। QC-QA পদগুলোর নিয়োগ পরীক্ষায় বিশ্লেষণী রসায়ন আর যন্ত্রপাতির (HPLC, স্পেকট্রোফটোমিটার) জ্ঞান যাচাই হয়, অনার্সে এই জায়গাগুলো মন দিয়ে করলে আলাদা সুবিধা পাবেন।
মেয়েদের জন্য রসায়ন কেমন?
ল্যাব-নির্ভর চাকরিগুলো (ফার্মা QC, টেস্টিং ল্যাব, গবেষণা) নিয়মিত সময়সূচির আর ক্যাম্পাস-শহরকেন্দ্রিক বলে ছাত্রীদের মধ্যে রসায়নের জনপ্রিয়তা বরাবরই বেশি, শিক্ষকতার পথটাও প্রশস্ত।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ থেকে রসায়ন পড়ে কি ইন্ডাস্ট্রিতে ঢোকা যায়?
যায়, নিয়োগ পরীক্ষায় ভালো করলে সার্টিফিকেটের প্রতিষ্ঠান-নাম বাধা হয় না। তবে ল্যাব-সুবিধা কম থাকলে ঘাটতিটা নিজে পোষাতে হবে: মাস্টার্স ভালো জায়গা থেকে করা, ইন্টার্নশিপ বা ট্রেনিং খুঁজে নেওয়া কাজে দেয়।
রসায়নের সাথে কোন স্কিল যোগ করলে বাজারদর বাড়ে?
ইনস্ট্রুমেন্টাল অ্যানালাইসিসের হাতে-কলমে দক্ষতা (HPLC/GC), GMP-ISO স্ট্যান্ডার্ডের ধারণা, ডেটা হ্যান্ডলিং (Excel ভালোভাবে, পারলে Python-R-এর ছোঁয়া), আর ইংরেজি রিপোর্ট লেখার হাত। এই চারটাই ইন্ডাস্ট্রি আর উচ্চশিক্ষা দুই জায়গায় কাজে লাগে।
HSC-র রেজাল্ট দিয়ে কোথায় আবেদন করতে পারব বুঝব কীভাবে?
বিজ্ঞান ইউনিটগুলোর GPA শর্ত সার্কুলারে থাকে, নিজের রেজাল্ট জিপিএ ক্যালকুলেটরে সাজিয়ে মিলিয়ে নিন। রেজাল্ট দেখা আর পরের ধাপগুলোর গাইড আছে এখানে।

