সূচিপত্র
“গণিতে অনার্স? তারপর তো মাস্টারিই করবা।” পাড়ার এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে অনেক গণিতপ্রেমী পিছিয়ে যান। মজার ব্যাপার হলো, কথাটা অর্ধেক সত্য বলেই বিপজ্জনক: শিক্ষকতা আসলেই এই লাইনের বড় গন্তব্য, কিন্তু বাকি অর্ধেক গল্পে আছে ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় গণিত গ্র্যাজুয়েটদের দাপট, বিদেশে ফান্ডেড পিএইচডি, আর ডেটার যুগে হঠাৎ দামি হয়ে ওঠা ম্যাথ-ব্রেন।
Subject Review সিরিজের এই কিস্তি, a mathematics subject review in Bangla, পুরোটা পড়লে বিষয়টা নিয়ে সিদ্ধান্তটা অন্তত গুজবের ওপর দাঁড়িয়ে নিতে হবে না।
গণিত সাবজেক্ট রিভিউ (Mathematics Subject Review): সংক্ষেপে
- পড়ার বিষয়: ক্যালকুলাস-লিনিয়ার অ্যালজেবরা থেকে রিয়েল অ্যানালাইসিস, অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেবরার মতো প্রমাণনির্ভর গণিত, সাথে নিউমেরিক্যাল মেথড ও প্রোগ্রামিংয়ের ছোঁয়া
- কোথায়: প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ
- ক্যারিয়ার: শিক্ষকতা (সবচেয়ে বড়), ব্যাংক, বিসিএস, ডেটা-অ্যানালিটিক্স, গবেষণা-উচ্চশিক্ষা
- গোপন অস্ত্র: প্রোগ্রামিং শিখে নিলে ডেটা সায়েন্সের দরজা সরাসরি খোলে
- বাস্তবতা: “গণিতবিদ” পদের চাকরি দেশে প্রায় নেই, গণিত এখানে বিক্রি হয় দক্ষতা হিসেবে, পদবি হিসেবে না
প্রথমেই সাবধানবাণী: HSC-র গণিত আর অনার্সের গণিত এক না
HSC-তে গণিত মানে ছিল কৌশল: ইন্টিগ্রেশনের প্যাটার্ন চেনা, সূত্র বসিয়ে ঝড়ের গতিতে অঙ্ক নামানো। অনার্সের গণিত জিজ্ঞেস করে একদম অন্য প্রশ্ন: “কেন?” রিয়েল অ্যানালাইসিসে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে লিমিট জিনিসটা আসলে কী, অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেবরায় সংখ্যার বদলে কাজ করতে হবে কাঠামো নিয়ে। প্রথম বর্ষে এই ধাক্কাটা প্রায় সবাই খান, “অঙ্ক ভালো পারতাম বলে এসেছিলাম, এখানে তো অঙ্কই নেই, খালি প্রমাণ!” যাঁরা ধাক্কা সামলে প্রমাণের খেলাটা ধরে ফেলেন, তাঁদের জন্য বাকি তিন বছর রীতিমতো উপভোগ্য।
স্কুলজীবনে গণিত অলিম্পিয়াডের সমস্যা ভালো লাগত যাঁদের, ধরে নিতে পারেন অনার্সের গণিত আপনার জন্যই, কারণ অলিম্পিয়াডের সেই “কেন”-র খেলাটাই এখানে পুরো সিলেবাস জুড়ে।
গণিতে অনার্সে আসলে কী পড়ানো হয়?
- ভিত্তির বছর: ক্যালকুলাস, লিনিয়ার অ্যালজেবরা, জ্যামিতি, ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন
- বিশুদ্ধ গণিত: রিয়েল ও কমপ্লেক্স অ্যানালাইসিস, অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেবরা, টপোলজি, নাম্বার থিওরি
- ফলিত গণিত: নিউমেরিক্যাল অ্যানালাইসিস, মেকানিক্স, ফ্লুইড ডাইনামিক্স, অপটিমাইজেশন
- সাথে: সম্ভাব্যতা-পরিসংখ্যান, আর বেশিরভাগ সিলেবাসে এখন প্রোগ্রামিং (C/Python/MATLAB) ও কম্পিউটেশনাল ল্যাব
পরিসংখ্যানের অংশটুকু হাতে-কলমে ঝালাই করতে চাইলে আমাদের স্ট্যাটিসটিক্স ক্যালকুলেটর খুলে নিজের ডেটাসেট দিয়ে খেলে দেখতে পারেন, গড়-মিডিয়ান-স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশনের অনুভূতিটা পরিষ্কার হবে।
কোথায় পড়া যায়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ উপমহাদেশের পুরোনোগুলোর একটা, আর বিষয়টা এতই মৌলিক যে দেশের প্রায় প্রতিটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে (এমনকি বুয়েটেও, সার্ভিস-বিভাগ হিসেবে) গণিত বিভাগ আছে। ভর্তি বিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতেও গণিতে অনার্স জনপ্রিয়, বিশেষত যাঁদের লক্ষ্য শিক্ষকতা বা সরকারি চাকরি।
নিজের HSC রেজাল্টে কোন ইউনিটে আবেদন চলবে, দ্রুত মিলিয়ে নিন জিপিএ ক্যালকুলেটরে, আর রেজাল্ট-পরবর্তী পুরো ভর্তির টাইমলাইন আছে HSC Result গাইডে।
ক্যারিয়ার: শিক্ষকতা, ব্যাংক, ডেটা ও গবেষণা

- শিক্ষকতা: সত্যিই সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র, আর তাতে লজ্জার কিছু নেই: স্কুল-কলেজে গণিত শিক্ষকের চাহিদা চিরকালীন, ভালো গণিত পড়ানো মানুষের কোচিং-টিউশনির বাজারদর যেকোনো বিষয়ের মধ্যে শীর্ষে, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা তো আছেই।
- ব্যাংক: ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার বড় অংশ গণিত আর অ্যানালিটিক্যাল রিজনিং, ফলে গণিত গ্র্যাজুয়েটদের সাফল্যের হার এখানে চোখে পড়ার মতো, ব্যাপারটা এই মহলে ওপেন সিক্রেট।
- বিসিএস ও সরকারি: সাধারণ ও শিক্ষা ক্যাডার, পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ বিভিন্ন দপ্তর।
- ডেটা ও অ্যানালিটিক্স: ব্যাংক-টেলিকম-স্টার্টআপে ডেটা অ্যানালিস্ট, রিস্ক অ্যানালিস্ট, MIS পদ, শর্ত একটাই: প্রোগ্রামিং জানতে হবে (নিচের সেকশন)।
- গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা: রসায়ন-পদার্থের মতোই গণিতের ফান্ডেড পিএইচডির বাজার শক্তিশালী, বিশেষত ফলিত গণিত, কম্পিউটেশনাল সায়েন্সে।
- অ্যাকচুয়ারি ও ফাইন্যান্স: বিমা-ঝুঁকির গণিত। দেশে ক্ষেত্রটা এখনো ছোট, তবে বিদেশে (এবং রিমোটে) অ্যাকচুয়ারিয়াল পরীক্ষাগুলো দিয়ে এগোনো গণিত গ্র্যাজুয়েটদের জন্য উচ্চ-আয়ের এক স্বল্পচেনা রাস্তা।
গণিত + প্রোগ্রামিং = এই দশকের সেরা কম্বো

মেশিন লার্নিং জিনিসটা খুলে দেখলে ভেতরে পাওয়া যায় লিনিয়ার অ্যালজেবরা, ক্যালকুলাস আর সম্ভাব্যতা, মানে গণিতের অনার্স সিলেবাস। ডেটা সায়েন্সে ঢুকতে চাওয়া সিএসই গ্র্যাজুয়েটকে যে গণিতটা কষ্ট করে শিখতে হয়, আপনি সেটা এমনিই পড়ে ফেলছেন; উল্টো দিকে আপনার ঘাটতি শুধু প্রোগ্রামিং, যেটা অনলাইনে বিনা খরচে শেখা যায়। দ্বিতীয় বর্ষ থেকে Python আর SQL ধরুন, শেষ বর্ষে ডেটার দু-একটা প্রজেক্ট বানান, তাহলে গ্র্যাজুয়েশনের দিন আপনার সামনে শিক্ষকতা আর ব্যাংকের পাশাপাশি তৃতীয় একটা দরজাও খোলা থাকবে। প্রোগ্রামিং জগৎটা কেমন, ধারণা নিতে পড়ে দেখুন আমাদের সিএসই রিভিউ।
কাদের জন্য গণিত, কাদের জন্য না
গণিত তাঁদের জন্য, যাঁরা সমস্যার পেছনে লেগে থাকতে পারেন, “উত্তর মিলেছে”-র চেয়ে “কেন মিলল” জানায় বেশি আনন্দ পান, আর ক্যারিয়ারটা নিজের হাতে ডিজাইন করার স্বাধীনতা (এবং দায়িত্ব) নিতে রাজি। এই বিষয়ের ডিগ্রি আপনাকে রেডিমেড চাকরি দেবে না, দেবে সবচেয়ে বহুমুখী একটা মস্তিষ্ক, যেটা শিক্ষকতা, ব্যাংক, ডেটা, গবেষণা, যেদিকে ঘোরাবেন সেদিকেই কাজ করবে।
আর যাঁরা নির্দিষ্ট পেশার নিশ্চয়তা চান (ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ফার্মাসিস্ট ধাঁচের), প্রমাণনির্ভর বিমূর্ত পড়ায় ধৈর্য নেই, কিংবা HSC-র গণিতের নম্বর দেখে ভাবছেন অনার্সটাও ওরকমই হবে, তাঁদের জন্য সততার সাথে বলা: আগে উপরের “সাবধানবাণী” সেকশনটা আরেকবার পড়ুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
গণিত নাকি ফলিত গণিত নাকি পরিসংখ্যান?
গবেষণা-শিক্ষকতার ঝোঁকে বিশুদ্ধ গণিত, ইন্ডাস্ট্রি-ডেটার ঝোঁকে ফলিত গণিত বা পরিসংখ্যান এগিয়ে। সত্যি বলতে তিনটার মূল ভিত এক, আর ক্যারিয়ারের মোড়টা ঘোরে আপনার যোগ করা স্কিলে (প্রোগ্রামিং, পরীক্ষার প্রস্তুতি), বিভাগের নামে না।
গণিতে পড়ে কি সিএসই-র চাকরি পাওয়া যায়?
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পদে সিএসই গ্র্যাজুয়েটরাই এগিয়ে থাকবেন, তবে ডেটা অ্যানালিস্ট, ডেটা সায়েন্টিস্ট, কোয়ান্ট-ঘেঁষা পদে গণিত+প্রোগ্রামিং কম্বো রীতিমতো প্রতিদ্বন্দ্বী, অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েও।
গণিতে অনার্স করে বিদেশে পিএইচডি কতটা বাস্তব?
ভালো সিজিপিএ আর অধ্যাপকদের সুপারিশ থাকলে খুবই বাস্তব, গণিতের পিএইচডি প্রোগ্রামগুলো সাধারণত টিউশন মওকুফ আর স্টাইপেন্ডসহ চলে। সিজিপিএ-র হিসাব প্রথম দিন থেকে রাখুন, সিজিপিএ ক্যালকুলেটর আছেই।
মুখস্থবিদ্যায় ভালো, গণিতে আসব?
গণিত সম্ভবত মুখস্থের সবচেয়ে কম সুযোগ দেওয়া বিষয়: পরীক্ষায় আসে অচেনা সমস্যা আর প্রমাণ, নোট মুখস্থে সেগুলো নামে না। বোঝা আর চর্চাই একমাত্র রাস্তা, এটাকে সুখবর মনে হলে আসুন।
প্রথম বর্ষের ধাক্কাটা সামলানোর উপায় কী?
প্রমাণ লেখাটাকে নতুন ভাষা শেখার মতো নিন: প্রতিদিন অল্প করে, নিজে হাতে লিখে। সিনিয়র বা শিক্ষকের কাছে “এত কঠিন লাগছে কেন” স্বীকার করতে লজ্জা পাবেন না, ওই ধাপটা সবাই পার করেছেন। আর অলিম্পিয়াড-ধাঁচের সমস্যার বই ধরলে ব্যাপারটা খেলার মতো লাগবে।
রেজাল্টের পর কী করব?
আগে রেজাল্ট দেখে GPA-র হিসাব বুঝে নিন, তারপর বিজ্ঞান ইউনিটের সার্কুলার ধরে প্রস্তুতি। পড়াশোনার ফ্রি টুলগুলো এক জায়গায় পাবেন টুলস পেজে।

