সূচিপত্র
Study in Pharmacy and fly to America, এমন একটা স্লোগান চালু হয়ে যায় ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগ প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে। সময়ের পরিক্রমায় এটি এখন তিনটা বিভাগ নিয়ে গঠিত একটা পূর্ণাঙ্গ ফার্মেসী অনুষদ। এই ফার্মেসী সাবজেক্ট রিভিউতে ইতিহাস, কারিকুলাম, ভর্তি, বিশ্ববিদ্যালয় আর দেশে-বিদেশে ক্যারিয়ারের হালনাগাদ চিত্র থাকছে।
ভিডিও: ফার্মেসী সাবজেক্ট রিভিউ
ফার্মেসী সাবজেক্ট রিভিউ: সংক্ষেপে যা জানা দরকার
- কী পড়ানো হয়: রসায়ন, মানবদেহবিদ্যা, ওষুধবিদ্যা (Pharmacology, Pharmacognosy), মাইক্রোবায়োলজি-বায়োকেমিস্ট্রি, হসপিটাল ও ক্লিনিক্যাল ফার্মেসী, স্ট্যাটিস্টিক্স
- ভর্তি: বিজ্ঞান বিভাগ থেকে HSC, জীববিজ্ঞান ও রসায়নে ভালো দখল জরুরি
- কোথায় পড়বেন: ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহীসহ বেশ কয়েকটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, আর অসংখ্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়
- ক্যারিয়ার: ওষুধ কোম্পানি, হাসপাতাল/ক্লিনিক্যাল ফার্মেসী, শিক্ষকতা, বিসিএস, বিদেশে লাইসেন্সধারী ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ
- বেতন: ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের সাধারণ শুরু মাসে আনুমানিক ৳২০,০০০-৩০,০০০, অভিজ্ঞতার সাথে (৫-৯ বছরে) ৳৫০,০০০-৬০,০০০ বা তার বেশি
ইতিহাস ও বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বর্তমান অবস্থা
প্রথম দিকের বেশিরভাগ ফার্মাসিস্ট পাড়ি জমান আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে, কেউ কেউ কানাডা, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ায়। বাকিরা যারা দেশে থেকে যান, তাদের হাত ধরেই এগিয়েছে আমাদের ওষুধ শিল্প। পরবর্তীতে ফার্মেসী বিষয়টি চালু হয় জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও।
এই শিল্পের ফলাফল এখন চোখে পড়ার মতো। ২০২৬ সালের হিসাবে বাংলাদেশ নিজের ওষুধের চাহিদার প্রায় ৯৮ ভাগ নিজেই উৎপাদন করে, আর রপ্তানি হয় বিশ্বের প্রায় ১৫৭টি দেশে, যার মধ্যে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের মতো কঠোর নিয়ন্ত্রিত বাজারও আছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২১৩ মিলিয়ন ডলারের, আর ২০৩০ সালের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তবে এটা বলে রাখা সৎ হবে যে, একসময় ধারণা করা হয়েছিল ওষুধ ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হয়ে উঠবে, বাস্তবে সেটা এখনও হয়নি, তৈরি পোশাক শিল্প এখনও বহু গুণ এগিয়ে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি এবং আন্তর্জাতিক মানের কারখানার সংখ্যা দেখে বলা যায়, এই খাত ক্রমাগত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কী কী পড়ানো হয়
ফার্মেসীতে যা পড়ানো হয় তার মধ্যে রয়েছে রসায়ন (Inorganic, Organic, Physical, Analytical, Medicinal Chemistry), মানবদেহ সম্পর্কিত বিষয় (Physiology, Anatomy), ওষুধবিদ্যা (Pharmacognosy, Pharmacology, Pharmaceutical Technology, Quality Control, Pharmaceutical Engineering, Biopharmaceutics), লাইফ সায়েন্সের অন্যান্য বিষয় (Microbiology, Biochemistry, Biotechnology), এবং Hospital Pharmacy, Clinical Pharmacy, Statistics সহ আরও কিছু বিষয়। এত বিষয় দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তবে এসব পড়তে হলে জীববিজ্ঞান (মানবদেহ) ও রসায়নে ভালো দখল থাকা জরুরি।
ভর্তি ও যোগ্যতা
ফার্মেসী পড়তে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে HSC পাশ হওয়া বাধ্যতামূলক, জীববিজ্ঞান ও রসায়নে ভালো ভিত্তি থাকা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “ক” ইউনিটের মাধ্যমে ভর্তি হতে হয়, অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব বা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সাধারণত সহজতর হলেও, ফার্মেসী কাউন্সিল অব বাংলাদেশের (PCB) স্বীকৃতি আছে কিনা সেটা ভর্তির আগে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশে কোথায় পড়া যায়
| ধরন | বিশ্ববিদ্যালয় |
|---|---|
| পাবলিক | ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, খুলনা, জগন্নাথ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় |
| প্রাইভেট | এশিয়া প্যাসিফিক, স্টেট, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, সাউথ ইস্ট, ব্র্যাকসহ আরও বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় |
এই তালিকা ২০২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে, এরপর আরও কিছু পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ফার্মেসী প্রোগ্রাম চালু করে থাকতে পারে, তাই আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ও ফার্মেসী কাউন্সিল অব বাংলাদেশের স্বীকৃতি তালিকা দেখে নেওয়া ভালো।
ক্যারিয়ার সুযোগ ও বেতন (দেশে)
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে খুব একটা কেউ বেকার থাকেন না, যদিও ফার্মা ফিল্ডে চাকরির প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। দেশের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসী পড়ানো হয় বলে অনেকেই শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নেন, ভালো রেজাল্ট নিয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করলে শিক্ষকতায় ঢোকা তুলনামূলক সহজ। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীও ফার্মা ফিল্ডে কাজ করছেন, তবে প্রতি বছর অনেক গ্র্যাজুয়েট বের হওয়ায় ভালো মানের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে বিষয়টা নিয়ে একটু ভেবে দেখা ভালো।
বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে যাওয়ার পথও খোলা, শোনা যায় ৩৩তম বিসিএসে সারা বাংলাদেশে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন একজন ফার্মেসী গ্র্যাজুয়েট। ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের সাধারণ শুরু মাসে আনুমানিক ৳২০,০০০-৩০,০০০, প্রতিষ্ঠান ও পদভেদে কম-বেশি হতে পারে। অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে (৫-৯ বছরে) এই পরিসর ৳৫০,০০০-৬০,০০০ বা তার বেশি পর্যন্ত যেতে পারে, ঢাকায় গড়ে কিছুটা বেশি। এই পরিসর একাধিক সূত্র (worldsalaries, Payscale, Glassdoor) থেকে ক্রস-চেক করা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভেদে পার্থক্য হতে পারে।
দেশের বাইরে ক্যারিয়ার ও লাইসেন্সিং
একসময় প্রচুর ফার্মাসিস্ট দেশের বাইরে যেতেন, তবে ২০০৩ সালের পর আমেরিকা ৪ বছরের অনার্স ডিগ্রিধারীদের ফার্মাসিস্ট নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে দিচ্ছে না। অর্থাৎ আমেরিকায় ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করতে চাইলে ৫ বছরের অনার্স বা ফার্ম ডি (Pharm D) লাগবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০-২০১১ সেশন থেকে ৫ বছরের অনার্স চালু হয়েছে।
একটা ব্যাপার স্পষ্ট করে রাখা দরকার, আমাদের দেশে বেশিরভাগ ফার্মাসিস্ট যেমন ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করেন, বিদেশে বেশিরভাগ ফার্মাসিস্ট কমিউনিটি, রিটেইল, ক্লিনিক বা হাসপাতাল ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করেন, আর তার জন্য লাইসেন্সধারী ফার্মাসিস্ট হওয়া বাধ্যতামূলক। ৪ বছরের অনার্স নিয়ে আমেরিকা ছাড়া অন্য প্রায় যেকোনো দেশে গিয়ে নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করে ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করা সম্ভব। পিএইচডি করতে চাইলে অবশ্য আমেরিকাও একটা ভালো গন্তব্য হতে পারে। আমেরিকায় ফার্মেসী পড়ায় এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় কম হলেও, প্রচুর শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার্থে (মাস্টার্স বা পিএইচডি) আমেরিকা, যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশে যাচ্ছেন।
ফার্মেসী পড়ার একটা বড় সুবিধা হলো, এই বিষয়ে পড়ে উচ্চশিক্ষায় লাইফ সায়েন্সের প্রায় যেকোনো দিকে সুইচ করা সম্ভব। তাই যারা লাইফ সায়েন্স নিয়ে পড়তে চান, তাদের জন্য ফার্মেসী একটা স্বাভাবিক প্রথম পছন্দ হতে পারে। ওষুধবিজ্ঞান উপভোগ করতে পারলে ভালো লাগবে, নয়তো হতাশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই পড়লে মন দিয়েই পড়তে হবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ফার্মেসী পড়তে HSC-তে কী কী লাগে?
বিজ্ঞান বিভাগ থেকে HSC পাশ, সাথে জীববিজ্ঞান ও রসায়নে ভালো ভিত্তি থাকা জরুরি।
বাংলাদেশে ফার্মেসী গ্র্যাজুয়েটদের বেতন কেমন?
ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের সাধারণ শুরু মাসে আনুমানিক ৳২০,০০০-৩০,০০০, অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে ৳৫০,০০০-৬০,০০০ বা তার বেশি হতে পারে।
ফার্মেসী পড়ে কি আমেরিকায় ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করা যায়?
২০০৩ সালের পর থেকে আমেরিকায় ফার্মাসিস্ট নিবন্ধনের জন্য ৫ বছরের অনার্স বা ফার্ম ডি প্রয়োজন। ৪ বছরের অনার্স নিয়ে আমেরিকা ছাড়া অন্য প্রায় যেকোনো দেশে নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে কাজ করা যায়।
ফার্মেসী পড়ে কি শুধু ওষুধ কোম্পানিতেই চাকরি করা যায়?
না। ওষুধ কোম্পানির পাশাপাশি হাসপাতাল/ক্লিনিক্যাল ফার্মেসী, শিক্ষকতা, বিসিএস এবং উচ্চশিক্ষায় লাইফ সায়েন্সের অন্য যেকোনো শাখায় যাওয়ার সুযোগ থাকে।
আরও দেখুন: কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট রিভিউ এবং Faculty of Life & Earth Science এর অন্য সাবজেক্ট রিভিউ।

