সূচিপত্র
বিজ্ঞান চর্চার শুরুটা হয়েছিল গণিত দিয়ে, মধ্যযুগে পদার্থবিজ্ঞান সেই ধারায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে, নিউটন-গ্যালিলিও-আইনস্টাইন-বোরের হাত ধরে সেটা আধুনিক যুগে পৌঁছায়। কিন্তু বিশ শতকের বিশের দশকের পর পদার্থবিজ্ঞানের আবিষ্কারের গতি কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে, আর বিজ্ঞানীরা ঝুঁকতে থাকেন পরিবেশ, পৃথিবী, মানুষ আর জীবজগৎ নিয়ে গবেষণার দিকে। তাই একবিংশ শতাব্দীকে অনেকেই বলছেন জীববিজ্ঞানের শতাব্দী, আর এর পেছনে বড় একটা কারণ ১৯৭২ সালে পল বার্গের রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর আবিষ্কার। এই জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট রিভিউতে কারিকুলাম, ভর্তি, বিশ্ববিদ্যালয় আর ক্যারিয়ারের হালনাগাদ চিত্র থাকছে।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট রিভিউ: সংক্ষেপে যা জানা দরকার
- কী পড়ানো হয়: জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর পাশাপাশি মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স, ইমিউনোলজি, অর্গানিক কেমিস্ট্রি, এনজাইমোলজি, কম্পিউটেশনাল বায়োলজি, টিস্যু কালচার
- ভর্তি: বিজ্ঞান বিভাগ থেকে HSC, জীববিজ্ঞান ও রসায়নে শক্ত ভিত্তি জরুরি, আসনসংখ্যা তুলনামূলক সীমিত
- কোথায় পড়বেন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- ক্যারিয়ার: দেশে মূলত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ওষুধ কোম্পানির R&D, বিদেশে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ তুলনামূলক বেশি
- বেতন: সরকারি গবেষণা/৯ম গ্রেডে শুরুতে সর্বসাকুল্যে আনুমানিক ৳৩৫,০০০-৪৫,০০০, বেসরকারি ফার্মা R&D-তে পদভেদে ভিন্ন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে সুযোগ অনেক বেশি
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং আসলে কী
প্রাণরসায়নের সবচেয়ে আধুনিক এই শাখায় জীবনকে সংজ্ঞায়িত করা হয় অণু-পরমাণু পর্যায়ে, একে বলা হয় দ্য মলিকিউলার লজিক অফ লাইফ (The Molecular Logic of Life)। মাত্র চারটি হরফ, A-T-C-G দিয়ে লেখা এই বিষয়কে অনেকে বলেন ঈশ্বরের ভাষা। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত ট্রান্সজেনিক অর্থাৎ উন্নত বৈশিষ্ট্যধারী উদ্ভিদ ও প্রাণী তৈরিতে কাজ করে। নামের শেষে ইঞ্জিনিয়ারিং যুক্ত হওয়ার কারণ, জীববিজ্ঞানের এই একটা শাখাতেই নিজের ইচ্ছামতো ডিজাইন করে একটা জীব তৈরি করা যায়, নিজের পছন্দমতো ই.কোলাই ডিজাইন করা যায় যেটা নিজের কথামতো চলে। কাজটা অনেকটা একটা প্রোগ্রাম ডিজাইন করার মতো, যা আপনার নির্দেশ মেনে চলে। একজন গবেষকের জন্য এর চেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা খুব কমই আছে, যখন সম্পূর্ণ জীবন্ত কিছু একটা নিজের ডিজাইন অনুযায়ী কাজ করে।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই বিষয়ের সাথে জুড়ে দেওয়া হয় বায়োটেকনোলজিকে, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং যার একটা অংশ মাত্র। বায়োটেকনোলজির অন্যান্য শাখা হলো মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স, ইমিউনোলজি, অর্গানিক কেমিস্ট্রি, এনজাইমোলজি, ইনসিলিকো বা কম্পিউটেশনাল বায়োলজি, টিস্যু কালচার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিভাগে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর পাশাপাশি এই সবগুলো বিষয়ই শেখানো হয়, তাই একজন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার একইসাথে মাইক্রোবায়োলজিস্ট, কারণ নিজের ব্যাকটেরিয়া তাকে পেট্রি ডিশে জন্মাতে হয়, বায়োকেমিস্ট, কারণ নিজের তৈরি জীব থেকে সংগৃহীত প্রোটিন তাকে বিশ্লেষণ করতে হয়, পরিসংখ্যানবিদ, কারণ ৩.২ বিলিয়ন বেস পেয়ারের মাঝে তাকে ধারণা করে কাজ করতে হয়, অর্গানিক কেমিস্ট, কারণ নিজের আবিষ্কৃত ওষুধের আণবিক গঠন তাকে বের করতে হয়, আর পরিশেষে একজন প্রকৌশলী, কারণ বিশাল ডিএনএ বিশ্লেষণের জন্য তাকে সফটওয়্যার ডিজাইন করতে হয়। এখানে পড়ে আপনি সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠবেন Jack of all traits, master of some।
ভিডিও: জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি সাবজেক্ট রিভিউ
কী গুণ লাগবে এই বিষয়ে পড়তে
বিশ্বের এই আধুনিকতম বিষয়ে পড়তে হলে অভূতপূর্ব চিন্তাশক্তি লাগে, কঠোর পরিশ্রমী হতে হয়, মানবিক গুণসম্পন্ন বিশেষ করে দায়িত্ববান হতে হয়, পাশাপাশি জীববিজ্ঞান, জৈব রসায়ন আর প্রোগ্রামিং-এ দক্ষ হতে হয়। চিন্তাশক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে এমন কিছু করা সম্ভব যা আগে কেউ ভাবতেও পারেনি, যেমন একবার এক বিজ্ঞানী ছাগলের দুধে মাকড়সার জালের মতো সূতা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, যেটা হতে পারত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সূতাগুলোর একটা। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে তিনি সফল হয়েছিলেন এবং তৈরি করেছিলেন বায়োস্টিল।
এত অবিশ্বাস্য আবিষ্কার একদিনে হয় না, তাই কঠোর পরিশ্রমী হওয়া জরুরি। ল্যাবে দৈনিক অনেক ঘণ্টা কাজ করতে হতে পারে, আরামপ্রিয় হলে এখানে টিকে থাকা কঠিন। দেশে চাকরির ক্ষেত্র তুলনামূলক কম হলেও, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির কথা বাদ দিলে, বিদেশে গবেষণার সুযোগ অনেক বেশি, বেতনও অনেক বেশি। বাংলাদেশে সরকার প্রতিটি আসনের পেছনে তুলনামূলক বেশি খরচ করে, কারণ প্রতি বছর ভর্তির সুযোগ পান হাতে গোনা কয়েকজন। তাই ভালো ফল করে বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে সেখানেই থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে, বিষয়টা নিয়ে ভালোভাবে ভেবে দেখা দরকার। মানবিকতা এখানে বড় একটা ব্যাপার, কারণ নৈতিক দিকগুলো আজকাল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয়। এই কারণেই এখানে এথিক্যাল ইস্যু নিয়েও আলাদা কোর্স পড়ানো হয়।
কী কী পড়ানো হয়
মূল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সগুলোর পাশাপাশি নিচের বিষয়গুলো পড়ানো হয়:
- মাইক্রোবায়োলজি
- বায়োকেমিস্ট্রি
- বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স
- ইমিউনোলজি
- অর্গানিক কেমিস্ট্রি
- এনজাইমোলজি
- ইনসিলিকো (কম্পিউটেশনাল) বায়োলজি
- টিস্যু কালচার
- মলিকুলার জেনেটিক্স
বাংলাদেশের অর্জন
বাংলাদেশের এ যাবৎকালের অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক অর্জন হিসেবে ধরা হয় পাটের জীবনরহস্য (জিনোম) এবং এর ক্ষতিকর পরজীবী ছত্রাকের জিনোম উন্মোচনকে। এই আবিষ্কারকে বাস্তব প্রয়োগে নিয়ে যাওয়াটা এখন এই দেশের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারদেরই দায়িত্ব, আর দেশের অনেক গবেষক ইতিমধ্যে এটা নিয়ে কাজ করছেন এবং আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে নিয়মিত প্রকাশনা করছেন। বিশ্বব্যাপী এই সাবজেক্টের গুরুত্ব বোঝা যায় নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস থেকেও, ২০১২ সালে জন গার্ডন এবং শিনিয়া ইয়ামানাকা চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান পরিণত কোষকে পুনরায় প্রোগ্রাম করে ভ্রূণসদৃশ স্টেম কোষে (induced pluripotent stem cell) রূপান্তরের আবিষ্কারের জন্য, যেটা টিস্যু কালচার ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত একটা ক্ষেত্র। বায়োকেমিস্ট্রি সংশ্লিষ্ট গবেষকরাও প্রায় প্রতি বছর কেমিস্ট্রির নোবেল পুরস্কারের বড় অংশ নিয়ে যান। বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে এই খাতের গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ বাড়াচ্ছে, গবেষণাগারগুলো ধীরে ধীরে আধুনিক হয়ে উঠছে।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা
ভর্তি ও যোগ্যতা
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি পড়তে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে HSC পাশ হওয়া বাধ্যতামূলক, জীববিজ্ঞান ও রসায়নে শক্ত ভিত্তি থাকা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগে প্রতি বছর তুলনামূলক সীমিত সংখ্যক আসনে ভর্তির সুযোগ থাকে, ফলে ভর্তি প্রতিযোগিতা বেশ কঠিন। রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষা বা সমন্বিত পরীক্ষার মাধ্যমে সুযোগ মেলে। সুনির্দিষ্ট আসনসংখ্যা ও শর্ত প্রতি বছর বদলাতে পারে, তাই আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের হালনাগাদ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেখে নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে কোথায় পড়া যায়
| বিশ্ববিদ্যালয় | বিভাগের নাম |
|---|---|
| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | Department of Genetic Engineering and Biotechnology (যাত্রা শুরু ২০০১ সালে) |
| রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় | Department of Genetic Engineering and Biotechnology |
| জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় | Department of Biotechnology and Genetic Engineering (নাম উল্টো ক্রমে) |
এছাড়া কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও কাছাকাছি ধরনের বায়োটেকনোলজি প্রোগ্রাম আছে, তবে কারিকুলাম ও গবেষণাগার সুবিধা যাচাই করে নেওয়া ভালো।
ক্যারিয়ার সুযোগ ও বেতন
এই বিষয়ের প্রধান ক্ষেত্র গবেষণা। দেশে চাকরির সুযোগ তুলনামূলক কম, তবে যেসব সুযোগ আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর R&D বিভাগ (যেমন স্কয়ার, বেক্সিমকো, ইনসেপ্টা, রেনাটার মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষণা শাখা), বিসিএসআইআর (BCSIR), আইসিডিডিআরবি (icddr,b) এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং একাডেমিয়া। বিদেশে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা শেষ করে পিএইচডি বা পোস্টডক পর্যায়ে, সুযোগ এবং বেতন দুটোই অনেক বেশি।

সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিসিএস কারিগরি ক্যাডারের ৯ম গ্রেডে শুরুতে সর্বসাকুল্যে বেতন আনুমানিক ৳৩৫,০০০-৪৫,০০০ এর মধ্যে থাকে। বেসরকারি ফার্মা R&D-তে শুরুর বেতন প্রতিষ্ঠান ও পদভেদে ভিন্ন হতে পারে, অভিজ্ঞতা ও গবেষণা প্রকাশনার সাথে সাথে এটা দ্রুত বাড়ে। এই পরিসরকে নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি হিসেবে না নিয়ে একটা ধারণা হিসেবে নেওয়া ভালো, কারণ ৯ম জাতীয় বেতনস্কেল এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
সম্পর্কিত সাবজেক্ট
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজির সবচেয়ে কাছের সাবজেক্ট উদ্ভিদবিজ্ঞান, কারণ উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ থেকেও পরবর্তীতে অনেকে এই ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হন। মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞানও একই অনুষদের (Faculty of Life & Earth Science) অধীনে পড়ানো হয় এবং রসায়ন-জীববিজ্ঞান নির্ভর হওয়ায় আগ্রহের জায়গাটা কাছাকাছি। বিস্তারিত জানতে আমাদের উদ্ভিদবিজ্ঞান সাবজেক্ট রিভিউ এবং মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান সাবজেক্ট রিভিউ পোস্ট দুটো পড়তে পারেন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি (GEB) আসলে কী নিয়ে পড়ায়?
ডিএনএ পর্যায়ে জীবনকে বোঝা ও পরিবর্তন করার বিজ্ঞান, ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ ও প্রাণী তৈরি, পাশাপাশি মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, বায়োস্ট্যাটিস্টিক্সের মতো একাধিক শাখা একসাথে পড়ানো হয়।
GEB পড়তে কোথায় ভর্তি হওয়া যায়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট বিভাগ আছে।
GEB পড়ে দেশে চাকরির সুযোগ কেমন?
দেশে সুযোগ তুলনামূলক সীমিত, মূলত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর ওষুধ কোম্পানির R&D বিভাগে। বিদেশে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ অনেক বেশি।
GEB আর উদ্ভিদবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য কী?
উদ্ভিদবিজ্ঞান মূলত উদ্ভিদকেন্দ্রিক, আর GEB সরাসরি জিন ও আণবিক পর্যায়ে যেকোনো জীবের ওপর কাজ করার প্রকৌশলগত দিকটা নিয়ে পড়ায়। তবে দুটো সাবজেক্টের মধ্যে বিষয়গত ওভারল্যাপ অনেক।
আরও দেখুন: Faculty of Life & Earth Science এর অন্য সাবজেক্ট রিভিউ।

