সূচিপত্র
বিজ্ঞানের আধুনিকতম বিষয়গুলোর মধ্যে একটা কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এই ক্ষেত্র প্রতি মুহূর্তেই আরও বিকশিত হচ্ছে, যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন গবেষণা আর কাজের ক্ষেত্র। অনেকেরই একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে যে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর কেমিস্ট্রি মোটামুটি একই ক্যাটাগরির, বাস্তবে দুটো বেশ আলাদা। এই কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট রিভিউতে কারিকুলাম, ভর্তি, বিশ্ববিদ্যালয় আর ক্যারিয়ারের হালনাগাদ চিত্র থাকছে।
কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট রিভিউ: সংক্ষেপে যা জানা দরকার
- কী পড়ানো হয়: থার্মোডাইনামিক্স, ফ্লুইড মেকানিক্স, হিট ও ম্যাস ট্রান্সফার, রিয়েক্টর ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রসেস কন্ট্রোল
- ভর্তি: বিজ্ঞান বিভাগ থেকে HSC, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে শক্ত ভিত্তি জরুরি
- কোথায় পড়বেন: BUET, DUET (গাজীপুর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
- ক্যারিয়ার: সার-সিমেন্ট-টেক্সটাইল-ওষুধ-পেট্রোলিয়াম শিল্প, গবেষণা, উচ্চশিক্ষায় নিউক্লিয়ার/বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং এর মতো শাখায় সুইচ করার সুযোগ
- বেতন: ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের সাধারণ শুরু মাসে আনুমানিক ৳২৫,০০০-৪৫,০০০, অভিজ্ঞতার সাথে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে
কেমিস্ট আর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের পার্থক্য
একজন কেমিস্টের মূল কাজ ল্যাবে, আর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ প্রধানত ইন্ডাস্ট্রিতে। একজন রসায়নবিদ যে প্রক্রিয়া ল্যাবের বিকারে ঘটান, একজন ইঞ্জিনিয়ার সেই একই কাজকে শিল্পক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কেমিক্যাল প্ল্যান্টে প্রয়োগ করেন। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন আর লাইফ সায়েন্সের (জীববিজ্ঞান, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি) সাথে ইঞ্জিনিয়ারিং এর সমন্বয় ঘটিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক উপায়ে কাঁচামাল থেকে ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী তৈরির প্রক্রিয়া। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের প্রধান কাজ মূলত দুই ধরনের, প্ল্যান্ট ডিজাইন-ম্যানুফ্যাকচারিং-অপারেশন, আর নতুন বা উন্নত পণ্যের ডেভেলপমেন্ট।
গবেষণা ও বিশেষায়িত ক্ষেত্র
আধুনিক বিজ্ঞানের একটা বিশাল সেক্টর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, পড়াশোনা আর গবেষণার সুযোগ দুটোই বিশাল। এখানে হিট ট্রান্সফার, ম্যাস ট্রান্সফারের মতো বিষয়ের পাশাপাশি নিচের যেকোনো একটা ক্ষেত্রে বিশেষায়িত হওয়া যায়:
- Biochemical Engineering
- Biomedical Engineering
- Chemical Reactor Engineering
- Computational Fluid Dynamics
- Corrosion Engineering
- Electrochemistry
- Environmental Engineering
- Food and Nutrition Science
- Metallurgy
- Mineral Processing
- Nanotechnology
- Nuclear Reprocessing
- Oil Exploration
- Oil Refinery
- Pharmaceuticals
- Plastics, Polymers
- Process Control, Design, Development
- Paper Technology
- Textile Engineering
- Water Technology
এতগুলো বিষয়ে গবেষণার সুযোগ অন্য কোনো একক সাবজেক্টে সহজে পাওয়া যায় না। ইচ্ছে থাকলে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে পরবর্তীতে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বা বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং এর মতো শাখাতেও উচ্চশিক্ষা নেওয়া সম্ভব।
কী কী পড়ানো হয়
- থার্মোডাইনামিক্স
- ফ্লুইড মেকানিক্স
- হিট ট্রান্সফার
- ম্যাস ট্রান্সফার
- কেমিক্যাল রিয়েকশন ইঞ্জিনিয়ারিং
- প্রসেস কন্ট্রোল অ্যান্ড ইনস্ট্রুমেন্টেশন
- প্ল্যান্ট ডিজাইন
- ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স
ভর্তি ও যোগ্যতা
কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে HSC পাশ হওয়া বাধ্যতামূলক, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে শক্ত ভিত্তি জরুরি। BUET-এর নিজস্ব আলাদা ভর্তি পরীক্ষা আছে, যেখানে আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রতিযোগিতা বেশ কঠিন। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়টা “অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং” নামে একটা যৌথ বিভাগের অধীনে পড়ানো হয়, ভর্তি হয় নিজস্ব বা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে। সুনির্দিষ্ট আসনসংখ্যা ও শর্ত প্রতি বছর বদলাতে পারে, তাই আবেদনের আগে হালনাগাদ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেখে নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে কোথায় পড়া যায়
| বিশ্ববিদ্যালয় | বিভাগের ধরন |
|---|---|
| BUET | স্বতন্ত্র কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম বিভাগগুলোর একটি |
| DUET, গাজীপুর | স্বতন্ত্র কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, প্রতিষ্ঠিত ২০১৭ সালে |
| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | Applied Chemistry and Chemical Engineering (যৌথ বিভাগ) |
| রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় | Applied Chemistry and Chemical Engineering (যৌথ বিভাগ) |
| নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় | Applied Chemistry and Chemical Engineering (যৌথ বিভাগ) |
কর্মক্ষেত্র ও বেতন
যতদিন পৃথিবীতে শিল্পকারখানা থাকবে, ততদিন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা থাকবে। বাংলাদেশ শিল্পক্ষেত্রে যত এগোবে, এই বিষয়ের কাজের ক্ষেত্রও তত বিস্তৃত হবে। দেশে এই বিষয়ে পড়ার সুযোগ অল্প কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, ফলে প্রতি বছর গ্র্যাজুয়েট সংখ্যাও কম থাকে, যেটা চাকরির বাজারে একটা বাড়তি সুবিধা হিসেবে কাজ করতে পারে। দেশে যেসব শিল্প খাতে কাজের সুযোগ আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- সার কারখানা
- পেপার মিল
- সুগার মিল
- গ্লাস ও সিরামিক শিল্প
- ওষুধ শিল্প, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি
- টেক্সটাইল কোম্পানি
- কসমেটিকস কোম্পানি
- পেট্রোলিয়াম
- পারমাণবিক প্ল্যান্ট
- সিমেন্ট কারখানা
- তেল উত্তোলন ও পরিশোধন
- ট্যানারি শিল্প
- বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ
খাবারের চিপস থেকে শুরু করে কম্পিউটারের মাইক্রোচিপ, বড় বড় মিল আর কোটি টাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রক্রিয়া, সবকিছুর পেছনেই থাকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের হাত।

ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের সাধারণ শুরু মাসে আনুমানিক ৳২৫,০০০-৪৫,০০০, প্রতিষ্ঠান ও পদভেদে কম-বেশি হতে পারে। এই সংখ্যা নিয়ে একটা সততার জায়গা রাখা দরকার, কিছু বেতন-অনুসন্ধানী ওয়েবসাইটে বাংলাদেশি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য এর চেয়েও অনেক কম সংখ্যা (মাসে ১৩,০০০ টাকার কাছাকাছি) দেখা যায়, কিন্তু সেই সংখ্যাগুলো BUET-এর মতো অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক বিভাগগুলোর বাস্তবতার সাথে ঠিক মেলে না বলে এখানে সেই নির্দিষ্ট সংখ্যা তুলে ধরা হয়নি। ২০১১ সালে AIChE-এর এক জরিপ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটের বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ১,১০,০০০ ডলার, তবে এটা দেড় দশক পুরনো এবং সরাসরি বাংলাদেশের বাজারের সাথে তুলনীয় না, নিছক একটা ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হলো।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর কেমিস্ট্রির পার্থক্য কী?
কেমিস্টের কাজ মূলত ল্যাবে, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের কাজ শিল্পক্ষেত্রে সেই একই প্রক্রিয়া বড় পরিসরে নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রয়োগ করা।
কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে কোথায় ভর্তি হওয়া যায়?
BUET, DUET (গাজীপুর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়ে পড়ার সুযোগ আছে।
কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের বেতন কেমন?
ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের সাধারণ শুরু মাসে আনুমানিক ৳২৫,০০০-৪৫,০০০, অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে এই পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে কি নিউক্লিয়ার বা বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং এ যাওয়া যায়?
হ্যাঁ, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর বিস্তৃত ভিত্তির কারণে উচ্চশিক্ষায় নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং এর মতো সংশ্লিষ্ট শাখায় সুইচ করা সম্ভব।
আরও দেখুন: ফার্মেসী সাবজেক্ট রিভিউ, এমএমই সাবজেক্ট রিভিউ এবং Faculty of Engineering এর অন্য সাবজেক্ট রিভিউ।

