ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমে চারুকলা নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে কথাটা শোনা যায়, সেটা হলো “আঁকতে না পারলে ওখানে যাওয়ার দরকার নেই”। কথাটা অর্ধেক সত্যি। তবে যেটা বেশিরভাগ শিক্ষার্থী জানেন না তা হলো, চারুকলার আটটি বিভাগের মধ্যে Graphic Design এমন একটা বিষয় যেটার চাকরির বাজার এখন প্রযুক্তি খাতের সাথে সরাসরি জড়িয়ে গেছে। এই রিভিউতে বিষয়টার পড়াশোনা, ভর্তির হিসাব আর ক্যারিয়ারের বাস্তব ছবিটা গুছিয়ে লিখলাম।
সূচিপত্র
Graphic Design-এ কী পড়ানো হয়
প্রথমেই একটা ভুল ধারণা সরিয়ে নিই। এখানে “ফটোশপ শেখানো” হয় না, অন্তত মূল বিষয় হিসেবে নয়। সফটওয়্যার শেখানো হয় ঠিকই, কিন্তু সেটাকে ধরা হয় হাতিয়ার হিসেবে, বিষয় হিসেবে নয়। চার বছরের বিএফএ কোর্সে যা শেখানো হয়:
- মৌলিক ড্রইং ও রঙ: প্রথম বর্ষে সব বিভাগের শিক্ষার্থীই ফিগার ড্রইং, স্টিল লাইফ আর রঙের তত্ত্ব করেন
- টাইপোগ্রাফি: অক্ষরের গঠন, বাংলা ও ইংরেজি টাইপফেস, লেটারিং। বাংলা টাইপোগ্রাফি এখানে আলাদা গুরুত্ব পায়
- ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন: একটা বার্তা ছবির মাধ্যমে কীভাবে পৌঁছায়, চিহ্ন ও প্রতীকের ব্যবহার
- ব্র্যান্ডিং ও আইডেন্টিটি: লোগো, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ড গাইডলাইন
- ইলাস্ট্রেশন: বইয়ের অলংকরণ, চরিত্র নকশা, সম্পাদকীয় ছবি
- প্রিন্ট ও প্রোডাকশন: ছাপার প্রক্রিয়া, কাগজ, রঙের ব্যবস্থাপনা
- ডিজিটাল ও মোশন: ওয়েব ও অ্যাপের ইন্টারফেস, অ্যানিমেশনের প্রাথমিক কাজ
শেখার আসল জায়গা কিন্তু স্টুডিও। ক্লাসে কাজ জমা দেওয়ার পর সেটা নিয়ে সবার সামনে আলোচনা হয়, ভুল ধরা পড়ে, আবার করতে হয়। এই ক্রিটিক সংস্কৃতিটাই ডিজাইনার তৈরি করে, আর অনলাইন কোর্সে ঠিক এই জিনিসটাই পাওয়া যায় না।
Graphic Design কেমন মানুষের জন্য
আঁকার হাত থাকলে ভালো, কিন্তু ডিজাইনে সবচেয়ে বেশি দরকার সমস্যা সমাধানের মানসিকতা। একটা ক্লায়েন্ট এসে বলবেন তাঁর প্রতিষ্ঠানকে “নির্ভরযোগ্য কিন্তু আধুনিক” দেখাতে হবে, আর আপনাকে সেটা রঙ, অক্ষর আর বিন্যাস দিয়ে দাঁড় করাতে হবে। ধৈর্যও লাগে, কারণ একটা লোগো দশবার বদলাতে বলা হতে পারে।
যাঁদের জন্য বিষয়টা কঠিন হয়ে যায়, তাঁরা সাধারণত দুই দলের। এক, যাঁরা শুধু নিজের মনের ছবি আঁকতে চান, কারণ ডিজাইন শেষ পর্যন্ত অন্যের প্রয়োজন মেটানোর কাজ। দুই, যাঁরা সমালোচনা নিতে পারেন না, কারণ এখানে কাজের সমালোচনা রোজকার ব্যাপার।
চারুকলা ইউনিটে ভর্তির হিসাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইউনিটের ২০২৫-২৬ সেশনের চিত্রটা দেখলে প্রতিযোগিতার মাত্রাটা বোঝা যায়। আটটি বিভাগ মিলিয়ে আসন মাত্র ১৩০টি, আর পরীক্ষায় বসেছিলেন ৬ হাজার ৫২১ জন। অর্থাৎ প্রতি আসনের বিপরীতে প্রায় ৫০ জন। পাসের হার ছিল ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
| অংশ | নম্বর | কী থাকে |
|---|---|---|
| সাধারণ জ্ঞান (MCQ) | ৪০ | বাংলা, ইংরেজি, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সাম্প্রতিক বিষয় |
| অঙ্কন (ব্যবহারিক) | ৬০ | ফিগার ড্রইং, অর্থাৎ সরাসরি মডেল দেখে মানুষের অবয়ব আঁকা |
| এসএসসি ও এইচএসসি জিপিএ | ২০ | দুই পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে |
| মোট | ১২০ | — |
নম্বরের ভাগটা মনোযোগ দিয়ে দেখুন। অঙ্কনেই সবচেয়ে বেশি ৬০ নম্বর, তাই প্রস্তুতির কেন্দ্রে থাকবে ফিগার ড্রইং। অনেকে সাধারণ জ্ঞানে জোর দিয়ে অঙ্কনটা শেষ দিকে রাখেন, আর সেখানেই পিছিয়ে পড়েন। মডেল দেখে আঁকার অভ্যাস কয়েক মাসে তৈরি হয় না, তাই এইচএসসির পর নয়, তার আগে থেকেই নিয়মিত আঁকা দরকার।
ভালো খবর হলো, বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা, তিন শাখা থেকেই আবেদন করা যায়। ২০২৫-২৬ সেশনে আবেদন ফি ছিল ১,২৫০ টাকা, আবেদন চলেছিল ২৯ অক্টোবর থেকে ১৬ নভেম্বর আর পরীক্ষা হয়েছিল ২৯ নভেম্বর ২০২৫। পরের সেশনের তারিখ ও ফি বিজ্ঞপ্তিতে বদলাতে পারে, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি মিলিয়ে নেবেন। জিপিএর ২০ নম্বর কীভাবে যোগ হয় বুঝতে দেখুন জিপিএ হিসাবের নিয়ম।

Graphic Design কোথায় পড়বেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও পরিচিত ঠিকানা, এখানে আটটি বিভাগ আছে: ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং, গ্রাফিক ডিজাইন, প্রিন্টমেকিং, প্রাচ্যকলা, ভাস্কর্য, সিরামিক, কারুশিল্প আর শিল্পকলার ইতিহাস। এর বাইরে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা অনুষদ আছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ও প্রিন্টমেকিং ডিসিপ্লিন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারি চারু ও কারুকলা কলেজগুলোতেও বিএফএ করা যায়।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়টা সাধারণত “গ্রাফিক ডিজাইন” বা “মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডিজাইন” নামে পড়ানো হয়, সেখানে সফটওয়্যার ও ইন্ডাস্ট্রির সাথে যোগাযোগ ভালো হলেও খরচ অনেক বেশি। খরচের তুলনা করতে ব্র্যাক আর নর্থ সাউথ রিভিউ দেখতে পারেন।
Graphic Design পড়ে ক্যারিয়ারের পথ
- বিজ্ঞাপনী এজেন্সি: ভিজ্যুয়ালাইজার, আর্ট ডিরেক্টর। কাজের চাপ বেশি, কিন্তু পোর্টফোলিও দ্রুত বড় হয়
- ইন-হাউস ব্র্যান্ড টিম: ব্যাংক, টেলিকম, এফএমসিজি কোম্পানির নিজস্ব ডিজাইন বিভাগ। সময় তুলনামূলক নিয়মিত
- প্রযুক্তি ও UI/UX: সফটওয়্যার কোম্পানিতে প্রোডাক্ট ডিজাইনার। বেতনের দিক থেকে এখন সবচেয়ে এগিয়ে থাকা পথ, তবে ইন্টারঅ্যাকশন ডিজাইন আলাদা করে শিখে নিতে হয়
- ফ্রিল্যান্সিং: আপওয়ার্ক, ফাইভার বা সরাসরি বিদেশি ক্লায়েন্ট। বাংলাদেশি ডিজাইনারদের জন্য ডলারে আয়ের বাস্তব সুযোগ এখানেই বেশি
- প্রকাশনা ও সংবাদমাধ্যম: বইয়ের প্রচ্ছদ, পত্রিকার লেআউট, ইনফোগ্রাফিক
- শিক্ষকতা: মাস্টার্সের পর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে
- নিজের স্টুডিও: কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার পর ছোট ডিজাইন ফার্ম দাঁড় করানো
একটা পরামর্শ দিয়ে শেষ করি, যেটা এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়। প্রথম বর্ষ থেকেই কাজ জমিয়ে রাখুন, কারণ এই পেশায় নিয়োগের সময় সার্টিফিকেট নয়, পোর্টফোলিও দেখা হয়। যিনি চার বছরে ত্রিশটা সম্পূর্ণ প্রজেক্ট জমিয়েছেন, তিনি পাস করার দিনই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকেন।
পোর্টফোলিও কীভাবে বানাবেন
এই পেশায় নিয়োগের সময় প্রায় কেউ সার্টিফিকেট দেখে না, দেখে কাজ। তাই পোর্টফোলিওটাই আপনার আসল সিভি। ভালো পোর্টফোলিওর কয়েকটা বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো শিক্ষার্থীদের কাজে সাধারণত অনুপস্থিত থাকে।
- সংখ্যা নয়, বাছাই: ত্রিশটা মাঝারি কাজের চেয়ে আটটা শক্তিশালী কাজ ভালো। দুর্বল কাজ রাখলে পুরো পোর্টফোলিওর গড় নেমে যায়
- প্রক্রিয়া দেখান: শুধু চূড়ান্ত লোগো নয়, প্রথম স্কেচ, বাতিল হওয়া বিকল্প আর কেন এই সিদ্ধান্ত, সেটাও রাখুন। নিয়োগদাতারা চিন্তার পথটা দেখতে চান
- সমস্যা-সমাধানের ভাষায় লিখুন: “একটা বেকারির লোগো” না লিখে লিখুন কী সমস্যা ছিল, কী করেছেন, ফল কী হয়েছে
- বাংলা কাজ রাখুন: বাংলা টাইপোগ্রাফিতে দক্ষতা দেখাতে পারলে দেশের বাজারে আলাদা কদর পাওয়া যায়, কারণ ভালো বাংলা ডিজাইনার তুলনামূলক কম
- বাস্তব প্রয়োগে দেখান: লোগোটা সাইনবোর্ডে, প্যাকেটে বা অ্যাপে কেমন দেখাবে, সেই মকআপ যোগ করুন
ক্লায়েন্টের কাজ না থাকলে নিজেই কাল্পনিক প্রজেক্ট বানান, তবে সেটা স্পষ্ট করে লিখে দিন। পরিচিত কোনো ছোট দোকান, বইয়ের দোকান বা স্কুলের জন্য বিনামূল্যে একটা পরিচয়পত্র বানিয়ে দিলে বাস্তব ক্লায়েন্টের অভিজ্ঞতাও হয়, কাজও জমে।
সফটওয়্যার আর পড়াশোনার ভারসাম্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সে সফটওয়্যারের ওপর জোর তুলনামূলক কম থাকে, আর এটা নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন। বাস্তবতা হলো, প্রতিষ্ঠান আপনাকে ডিজাইনের বোধ শেখাবে, আর হাতিয়ার শেখার দায়িত্ব অনেকটাই আপনার। এই ভাগটা মেনে নিলে চার বছরের ব্যবহারটা ভালো হয়।
একটা কার্যকর ক্রম হতে পারে এরকম: প্রথম বর্ষে হাতে আঁকা আর রঙের কাজে মন দিন, দ্বিতীয় বর্ষে ভেক্টর সফটওয়্যার (ইলাস্ট্রেটর বা বিনামূল্যের বিকল্প), তৃতীয় বর্ষে লেআউট ও প্রিন্ট প্রোডাকশন, আর চতুর্থ বর্ষে যে দিকে যেতে চান সেই অনুযায়ী বিশেষায়ন, যেমন ইন্টারফেস ডিজাইন বা মোশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কোর্স-কাঠামো ও বিভাগের বিস্তারিত দেখে নিতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল সাইটে।
সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
আঁকতে না পারলে কি Graphic Design পড়া যাবে না?
ভর্তি পরীক্ষাতেই ৬০ নম্বরের অঙ্কন আছে, তাই ন্যূনতম আঁকার দক্ষতা ছাড়া চারুকলা ইউনিটে টেকা কঠিন। তবে আঁকা একটা শেখার যোগ্য দক্ষতা, জন্মগত প্রতিভা নয়। নিয়মিত অনুশীলনে এক-দেড় বছরে বড় পরিবর্তন আসে।
বিজ্ঞান বিভাগ থেকে চারুকলায় আবেদন করা যায়?
যায়। বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা, তিন শাখার শিক্ষার্থীরাই চারুকলা ইউনিটে পরীক্ষা দিতে পারেন।
Graphic Design কি শুধু কোর্স করেই শেখা যায় না?
সফটওয়্যার চালানো অবশ্যই কোর্স করে শেখা যায়, আর অনেকে সেভাবেই কাজ শুরু করেন। পার্থক্যটা হয় ভিত্তিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরে রঙ, গঠন, টাইপোগ্রাফি আর শিল্পের ইতিহাস মিলিয়ে যে বোধ তৈরি হয়, সেটাই পরে সিনিয়র পদে ওঠার সময় কাজে লাগে।
ডিজাইনে আয় কেমন?
প্রতিষ্ঠান ও দক্ষতাভেদে পার্থক্য অনেক বড়, তাই নির্দিষ্ট অঙ্ক বলা বিভ্রান্তিকর হবে। সাধারণ ধারা হলো, শুরুতে এজেন্সির বেতন মাঝারি, ইন-হাউস ও প্রযুক্তি কোম্পানিতে বেশি, আর বিদেশি ক্লায়েন্টের ফ্রিল্যান্স কাজে আয়ের সীমা সবচেয়ে খোলা।
চারুকলার অন্য বিভাগগুলোর তুলনায় Graphic Design-এ চাকরি কি বেশি?
বাণিজ্যিক চাহিদার দিক থেকে হ্যাঁ, কারণ প্রতিটি ব্র্যান্ড, পত্রিকা আর অ্যাপের ডিজাইনার লাগে। তবে ভাস্কর্য বা প্রিন্টমেকিংয়ের নিজস্ব জগৎ আছে, সেখানে শিল্পচর্চা আর প্রদর্শনীভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়ে ওঠে। সব বিভাগের সার্বিক ছবি পেতে চারুকলা সাবজেক্ট রিভিউ দেখুন।

