চারুকলার আটটি বিভাগের মধ্যে Drawing and Painting সবচেয়ে পুরোনো আর সবচেয়ে ভুল-বোঝা বিষয়টা। বাসায় বললে অনেকে ধরে নেন ছেলে বা মেয়েটা “ছবি আঁকা শিখতে” যাচ্ছে, যেন এটা শখের ব্যাপার। অথচ এই বিভাগ থেকে বেরিয়েই দেশের বেশিরভাগ চিত্রশিল্পী, শিল্প-শিক্ষক আর ইলাস্ট্রেটর তৈরি হয়েছেন। এই রিভিউতে বিষয়টার পড়াশোনা, ৬০ নম্বরের অঙ্কন পরীক্ষার প্রস্তুতি আর পাস করার পরের পথগুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখলাম।
সূচিপত্র
Drawing and Painting-এ কী পড়ানো হয়
চার বছরের বিএফএ কোর্সে প্রথম বর্ষটা প্রায় সব বিভাগের জন্য একই থাকে, মৌলিক ড্রইং আর রঙের কাজ দিয়ে ভিত তৈরি হয়। তারপর বিভাগভিত্তিক গভীরে যাওয়া শুরু।
- ফিগার ড্রইং ও অ্যানাটমি: জীবন্ত মডেল দেখে আঁকা, হাড়-পেশির গঠন বোঝা। এটাই বিভাগের মেরুদণ্ড
- মাধ্যম নিয়ে কাজ: তেলরং, জলরং, অ্যাক্রিলিক, প্যাস্টেল, কালি-কলম, প্রতিটির আলাদা কৌশল
- কম্পোজিশন: ক্যানভাসে বিষয় সাজানো, আলো-ছায়া, রঙের ভারসাম্য
- ল্যান্ডস্কেপ ও আউটডোর স্টাডি: মাঠপর্যায়ে গিয়ে সরাসরি প্রকৃতি থেকে আঁকা
- ম্যুরাল ও বড় পরিসরের কাজ: দেয়ালচিত্র, স্থাপত্যের সাথে মিলিয়ে শিল্প
- শিল্পকলার ইতিহাস ও নন্দনতত্ত্ব: বাংলার লোকশিল্প থেকে ইউরোপীয় আধুনিকতা পর্যন্ত
বছরের শেষে থাকে প্রদর্শনী, আর চতুর্থ বর্ষে থাকে নিজের নির্বাচিত বিষয় নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রজেক্ট। এই প্রদর্শনীগুলোই পরে শিল্পীজীবনের প্রথম পরিচয়পত্র হয়ে দাঁড়ায়।
Drawing and Painting কেমন মানুষের জন্য
এই বিভাগটা তাঁদের জন্য যাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটা কাজে ডুবে থাকতে পারেন। একটা ফিগার স্টাডি শেষ করতে তিন-চার ঘণ্টা লাগে, আর সেটা হয়তো শিক্ষক দেখে বলবেন আবার করতে। ধৈর্য না থাকলে এই চক্রটা ক্লান্তিকর লাগবে।
আর্থিক দিকটা নিয়ে সৎ থাকা দরকার, কারণ এই জায়গায় অনেক শিক্ষার্থী পরে হতাশ হন। শুধু ছবি এঁকে জীবিকা চালানো বাংলাদেশে কঠিন, অন্তত শুরুর বছরগুলোতে। যাঁরা টিকে যান, তাঁরা প্রায় সবাই শিল্পচর্চার পাশাপাশি আরেকটা আয়ের পথ রাখেন, শিক্ষকতা, ইলাস্ট্রেশন বা ডিজাইনের কাজ। এটা ব্যর্থতা নয়, এটাই এই পেশার স্বাভাবিক গঠন। রঙ, ক্যানভাস আর মাধ্যমের খরচও মাথায় রাখতে হয়, কারণ সেটা প্রতি সেমিস্টারেই লাগে।
চারুকলা ভর্তি পরীক্ষার কাঠামো
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইউনিটে আটটি বিভাগ মিলে আসন ১৩০টি। ২০২৫-২৬ সেশনে পরীক্ষা দিয়েছিলেন ৬ হাজার ৫২১ জন, অর্থাৎ প্রতি আসনে প্রায় ৫০ জন প্রতিযোগী, আর শেষ পর্যন্ত পাস করেছিলেন ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
| অংশ | নম্বর | প্রস্তুতির গুরুত্ব |
|---|---|---|
| অঙ্কন (ফিগার ড্রইং) | ৬০ | সর্বোচ্চ, এখানেই ফল নির্ধারিত হয় |
| সাধারণ জ্ঞান (MCQ) | ৪০ | বাংলা, ইংরেজি, শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাম্প্রতিক |
| এসএসসি ও এইচএসসি জিপিএ | ২০ | আগেই নির্ধারিত, বদলানোর সুযোগ নেই |
| মোট | ১২০ | — |
বিজ্ঞান, মানবিক আর ব্যবসায় শিক্ষা, তিন শাখা থেকেই আবেদন করা যায়। ২০২৫-২৬ সেশনে আবেদন ফি ছিল ১,২৫০ টাকা, আবেদন চলে ২৯ অক্টোবর থেকে ১৬ নভেম্বর, পরীক্ষা হয় ২৯ নভেম্বর ২০২৫। নতুন সেশনে তারিখ বদলায়, তাই বিজ্ঞপ্তি বেরোলে সেটাই দেখে নেবেন।

Drawing and Painting-এর অঙ্কন পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নেবেন
৬০ নম্বরের ফিগার ড্রইংই যেহেতু ফল ঠিক করে দেয়, প্রস্তুতির পুরো পরিকল্পনাটা এর চারপাশে সাজানো উচিত। কয়েকটা কথা, যেগুলো অভিজ্ঞ শিক্ষকরা বারবার বলেন:
- মডেল দেখে আঁকার অভ্যাস করুন, ছবি দেখে নয়। ছবি দেখে আঁকলে দুই মাত্রা থেকে দুই মাত্রায় নকল হয়, কিন্তু পরীক্ষায় সামনে জীবন্ত মানুষ থাকে। বন্ধু বা পরিবারের কাউকে বসিয়ে আঁকুন
- সময় ধরে অনুশীলন করুন। নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করার চাপ আলাদা জিনিস, তাই ঘড়ি ধরে ২০, ৪০ আর ৬০ মিনিটের স্টাডি করুন
- অনুপাত আগে, বিস্তারিত পরে। মাথা, ধড় আর হাত-পায়ের অনুপাত ঠিক না হলে যত সুন্দর ছায়াই দিন, নম্বর কাটা যাবে
- জেসচার ড্রইং দিয়ে দিন শুরু করুন। দুই-তিন মিনিটে দ্রুত ভঙ্গি ধরার অনুশীলন হাতকে সাবলীল করে
- পুরোনো প্রশ্ন আর টিকে যাওয়া কাজ দেখুন। কোন ধরনের ভঙ্গি আসে আর ভালো খাতা দেখতে কেমন হয়, সেই ধারণাটা জরুরি
MCQ অংশটা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ ৪০ নম্বর কম নয়। এখানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি আর ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রশ্ন আসে, তাই জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসানের মতো শিল্পীদের কাজ, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ম্যুরাল ও ভাস্কর্য, আর সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক ঘটনাগুলো জেনে রাখুন।
Drawing and Painting পড়ে ক্যারিয়ারের পথ
- স্বাধীন শিল্পচর্চা: গ্যালারি প্রদর্শনী, শিল্পকর্ম বিক্রি, আর্ট রেসিডেন্সি। সময় লাগে, কিন্তু নাম দাঁড়ালে আয় ভালো
- শিক্ষকতা: স্কুল-কলেজে চারুকলার শিক্ষক, আর মাস্টার্সের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্থিতিশীল আয়ের সবচেয়ে পরিচিত পথ
- ইলাস্ট্রেশন: শিশুতোষ বই, পাঠ্যবই, পত্রিকার অলংকরণ, প্রচ্ছদ
- অ্যানিমেশন ও গেম আর্ট: কনসেপ্ট আর্ট, ক্যারেক্টার ডিজাইন, স্টোরিবোর্ড, দেশে এই খাতটা বাড়ছে
- বিজ্ঞাপন ও ডিজাইন স্টুডিও: ভিজ্যুয়ালাইজার হিসেবে কাজ, প্রয়োজনে ডিজিটাল দক্ষতা যোগ করে নিতে হয়
- সরকারি চাকরি: শিল্পকলা একাডেমি, জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, পাশাপাশি যেকোনো সাধারণ ক্যাডারের বিসিএস
- শিল্প সংরক্ষণ ও কিউরেশন: জাদুঘর ও গ্যালারিতে সংরক্ষণ, প্রদর্শনী পরিকল্পনা
যাঁরা বাণিজ্যিক দিকটায় বেশি আগ্রহী, তাঁদের জন্য গ্রাফিক ডিজাইন সাবজেক্ট রিভিউ পড়ে দুটো বিভাগ মিলিয়ে দেখাই ভালো। আর চারুকলার সব বিভাগের সার্বিক পরিচয় আছে আমাদের চারুকলা সাবজেক্ট রিভিউতে।
শুরুতে কী কী উপকরণ লাগবে
ভর্তির আগেই সব কিনে ফেলার দরকার নেই, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে কেনাই সাশ্রয়ী। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যা লাগে তা খুবই সামান্য: কয়েকটা পেন্সিল (2B থেকে 6B), কাগজ বা কার্টিজ প্যাড, ইরেজার, শার্পনার আর একটা ক্লিপবোর্ড। এই তালিকার বাইরে কিছু না কিনেও ফিগার ড্রইংয়ের পুরো প্রস্তুতি নেওয়া যায়।
ভর্তির পর প্রথম বর্ষে সাধারণত জলরং, পোস্টার কালার আর বড় কাগজ লাগে। তেলরং আর ক্যানভাসের খরচ শুরু হয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষ থেকে, আর তখনই বাজেট বাড়ে। সিনিয়রদের একটা পরামর্শ এখানে কাজে দেয়: দামি রঙের বড় সেট না কিনে অল্প কয়েকটা ভালো মানের রঙ কিনুন, কারণ প্রাথমিক রং মিশিয়ে বাকিগুলো বানিয়ে নেওয়া যায় আর সেই মেশানোর অনুশীলনটাই শেখার অংশ।
ক্যানভাস নিজে তৈরি করা শিখে নিলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। বেশিরভাগ চারুকলার শিক্ষার্থী দ্বিতীয় বর্ষেই ফ্রেম বানানো আর কাপড় টানটান করে প্রাইমার দেওয়া শিখে যান, আর এটা রেডিমেড কেনার চেয়ে অনেক সস্তা পড়ে।
প্রদর্শনী আর শিল্পীজীবনের শুরু
এই বিভাগে ক্যারিয়ার শুরু হয় চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নয়, কাজ দেখানো দিয়ে। বছরের শেষে বিভাগের বার্ষিক প্রদর্শনী, তারপর যৌথ প্রদর্শনী, আর একসময় একক প্রদর্শনী, এই ধাপগুলোই একজন শিল্পীর পরিচিতি তৈরি করে। প্রথম বর্ষ থেকেই কাজের ছবি গুছিয়ে রাখার অভ্যাস করলে পরে ডকুমেন্টেশন নিয়ে ভুগতে হয় না।
দেশে শিল্পচর্চার কয়েকটা নিয়মিত মঞ্চ আছে যেগুলোর দিকে নজর রাখা উচিত: জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী, তরুণ শিল্পীদের জন্য নির্দিষ্ট প্রদর্শনী, আর বিভিন্ন গ্যালারির উন্মুক্ত আহ্বান। এগুলোতে নির্বাচিত হওয়া জীবনবৃত্তান্তে বড় যোগ, বিশেষ করে বিদেশে এমএফএ বা রেসিডেন্সিতে আবেদনের সময়।
আর্থিক দিক থেকে বাস্তব পরামর্শটা হলো, শিল্পচর্চা আর আয়ের পথ দুটোকে শত্রু না ভাবা। শিক্ষকতা, ইলাস্ট্রেশন বা ডিজাইনের কাজ আয়ের ভিত্তি দেয়, আর সেই স্থিরতার ওপর দাঁড়িয়েই নিজের কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। যাঁরা শুরু থেকেই এই দ্বৈত পরিকল্পনা রাখেন, তাঁরাই দীর্ঘদিন টিকে থাকেন। বিভাগ ও ভর্তির হালনাগাদ তথ্যের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল সাইট দেখে নেবেন।
সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
কোচিং ছাড়া চারুকলায় চান্স পাওয়া সম্ভব?
সম্ভব, তবে কারও কাছে নিয়মিত কাজ দেখিয়ে নেওয়াটা বড় সুবিধা দেয়। নিজের ভুল নিজে ধরা কঠিন, বিশেষ করে অনুপাতের ভুল। কোচিং না করলেও অন্তত একজন অভিজ্ঞ শিল্পী বা সিনিয়রকে দিয়ে মাসে কয়েকবার কাজ দেখিয়ে নিন।
Drawing and Painting না গ্রাফিক ডিজাইন, কোনটা নেব?
আপনি যদি শিল্পী হিসেবে নিজের ভাষা তৈরি করতে চান, ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং। আর যদি ব্র্যান্ড, পণ্য আর যোগাযোগের সমস্যা সমাধান করতে চান আর দ্রুত চাকরির বাজারে ঢুকতে চান, গ্রাফিক ডিজাইন। মেধাক্রম ভালো হলে দুটোই বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
রঙ-তুলির খরচ কেমন?
মাধ্যমভেদে অনেক পার্থক্য। কাগজ-পেন্সিল-কালির কাজ তুলনামূলক সস্তা, কিন্তু তেলরং আর বড় ক্যানভাসের খরচ ভালোই। অনেকে বাজেট সামলাতে প্রথম দিকে ছোট আকারে কাজ করেন আর ভালো মানের কম উপকরণ কেনেন।
ভর্তি পরীক্ষায় কি রঙ করতে হয়?
চারুকলা ইউনিটের ব্যবহারিক অংশটা মূলত ফিগার ড্রইং, অর্থাৎ পেন্সিলে অবয়ব আঁকা। তবে বিজ্ঞপ্তিতে নির্দেশনা বদলাতে পারে, তাই পরীক্ষার আগে প্রকাশিত নির্দেশনা মিলিয়ে উপকরণ নিয়ে যাবেন।
Drawing and Painting পড়ে কি বিদেশে উচ্চশিক্ষা করা যায়?
যায়। ফাইন আর্টস, আর্ট হিস্ট্রি বা ভিজ্যুয়াল আর্টসে ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএফএ প্রোগ্রাম আছে, আর ভর্তির সময় পোর্টফোলিওই মূল বিবেচ্য। শুরু করতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার গাইড দেখুন।
চারুকলায় সেশনজট আছে?
ব্যবহারিক কাজ আর প্রদর্শনীনির্ভর মূল্যায়নের কারণে কিছু বিভাগে সময় একটু বেশি লাগতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগভেদে অবস্থা আলাদা, তাই ভর্তির আগে বর্তমান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জেনে নেওয়াই ভালো।

