সূচিপত্র
একটা ইন্টারভিউ বোর্ডে একজন BBA গ্র্যাজুয়েট আর একজন আইপিই গ্র্যাজুয়েট পাশাপাশি বসে আছেন, দুজনেই আবেদন করেছেন একই “প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট” পদে। এইটা দেখে অনেকেরই প্রথম প্রশ্ন হয়, “এইটা আবার কি!” আইপিই মানেই কি তাহলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ব্যবসা প্রশাসনের চাকরি করা? আসলে পুরো ব্যাপারটা উল্টো, আইপিই গ্র্যাজুয়েটরা কারখানার ভেতরের কারিগরি বাস্তবতা বোঝেন বলেই ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তগুলো তাদের হাতে আরও কার্যকর হয়। এই আইপিই সাবজেক্ট রিভিউতে কারিকুলাম, ভর্তি, বিশ্ববিদ্যালয় আর ক্যারিয়ারের হালনাগাদ চিত্র থাকছে।
ভিডিও: ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট রিভিউ
আইপিই সাবজেক্ট রিভিউ: সংক্ষেপে যা জানা দরকার
- কী পড়ানো হয়: Lean Sigma, Just in Time, Time Study, Supply Chain Management, Ergonomics, Quality Control সহ ফ্যাক্টরি অপারেশন সংক্রান্ত বিষয়াবলি
- ভর্তি: বিজ্ঞান বিভাগ থেকে HSC, পদার্থবিজ্ঞান-রসায়ন-গণিত-ইংরেজি বাধ্যতামূলক বিষয়
- কোথায় পড়বেন: BUET, RUET, KUET, DUET (গাজীপুর), BAUST (সৈয়দপুর)
- ক্যারিয়ার: FMCG ও ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির প্রোডাকশন-কোয়ালিটি-সাপ্লাই চেইন বিভাগ, টেলিকম, সিমেন্ট, তামাক শিল্প
- বেতন: ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের সাধারণ শুরু মাসে আনুমানিক ৳২০,০০০-৩০,০০০, অভিজ্ঞতা ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে
আইপিই আসলে কী, ইঞ্জিনিয়ারিং আর ব্যবস্থাপনার সেতু
ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) কে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় একটা কারখানার পুরো সিস্টেমকে যদি একটা যন্ত্র হিসেবে কল্পনা করা যায়, তাহলে। কাঁচামাল ঢোকা থেকে শুরু করে তৈরি পণ্য বের হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটাকে যতটা সম্ভব দক্ষ, কম খরচে আর কম সময়ে সম্পন্ন করার নকশা আর ব্যবস্থাপনাই আইপিই’র মূল কাজ। একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার যেখানে একটা নির্দিষ্ট যন্ত্র বা প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করেন, একজন আইপিই ইঞ্জিনিয়ার সেখানে পুরো সিস্টেমটাকে একসাথে দেখেন, মানুষ, যন্ত্র, উপকরণ, তথ্য আর অর্থ, সবকিছুর সমন্বয় কীভাবে সবচেয়ে ভালো হবে সেটা নিয়ে কাজ করেন। এই কারণেই আইপিই গ্র্যাজুয়েটরা প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট বা অপারেশনসের মতো পদে BBA-MBA গ্র্যাজুয়েটদের সাথে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, এবং কারখানার কারিগরি দিকটা হাতে-কলমে বোঝার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েও থাকেন।
আইপিই: ইঞ্জিনিয়ারিং আর ব্যবস্থাপনার মাঝের সেতু
কী কী পড়ানো হয়
আইপিই’র কারিকুলামে ইঞ্জিনিয়ারিং এর মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি এমন সব বিষয় পড়ানো হয় যেগুলো সরাসরি কারখানা চালানোর সাথে সম্পর্কিত:
- Facility Layout and Design
- Production Planning and Control
- Time and Motion Study
- Lean Manufacturing / Six Sigma
- Just in Time (JIT)
- Total Quality Management
- Supply Chain Management
- Operations Research
- Ergonomics
- Industrial Safety Engineering
- Inventory Control
- Project Management
লক্ষ্য একটাই, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অপচয় (waste) কমিয়ে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, সর্বোচ্চ মানের পণ্য সবচেয়ে কম খরচে তৈরি করা, যাকে অনেক সময় সংক্ষেপে “Zero Defect” লক্ষ্য বলা হয়।
ভর্তি ও যোগ্যতা
আইপিই পড়তে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে HSC পাশ হওয়া বাধ্যতামূলক, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও ইংরেজি আবশ্যিক বিষয়। BUET, RUET, KUET-এর মতো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিজস্ব বা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি হতে হয়, আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রতিযোগিতা যথেষ্ট কঠিন। প্রতি বছর সুনির্দিষ্ট আসনসংখ্যা ও শর্ত বদলাতে পারে, তাই আবেদনের আগে হালনাগাদ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেখে নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে কোথায় পড়া যায়
| বিশ্ববিদ্যালয় | উল্লেখযোগ্য তথ্য |
|---|---|
| BUET | আইপিই বিভাগের যাত্রা শুরু ১৯৮১ সালে স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম হিসেবে, স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি শুরু হয় ১৯৯৭ সাল থেকে |
| RUET | আইপিই বিভাগ প্রতিষ্ঠিত ২০০৫ সালে |
| KUET | B.Sc. Engineering in IPE প্রোগ্রাম চালু আছে |
| DUET, গাজীপুর | স্বতন্ত্র আইপিই বিভাগ আছে |
| BAUST, সৈয়দপুর | আইপিই বিভাগ আছে |
উল্লেখ্য, CUET-এ হুবহু “আইপিই” নামে বিভাগ নেই, তবে ২০১৫ সাল থেকে কাছাকাছি ধরনের একটা “Mechatronics and Industrial Engineering” বিভাগ চালু আছে, যেটা আলাদা একটা প্রোগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
কর্মক্ষেত্র ও বেতন
আইপিই গ্র্যাজুয়েটদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, প্রায় যেকোনো উৎপাদনমুখী শিল্পেই তাদের চাহিদা থাকে। দেশের বড় বড় FMCG আর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি, যেমন BATB, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, নেসলে বাংলাদেশ, শেভরন বাংলাদেশ, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, এদের প্রোডাকশন, কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স, সাপ্লাই চেইন বিভাগে আইপিই গ্র্যাজুয়েটদের নিয়মিত নিয়োগ দেওয়া হয়। দেশের বাইরে ইন্টেলের মতো বড় বড় ম্যানুফ্যাকচারিং ও প্রযুক্তি কোম্পানিতেও আইপিই ব্যাকগ্রাউন্ডের ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা আছে।

ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের সাধারণ শুরু মাসে আনুমানিক ৳২০,০০০-৩০,০০০, বেতন-অনুসন্ধানী ওয়েবসাইটের হিসাবে বাংলাদেশে একজন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারের গড় বার্ষিক বেতন প্রায় ২,৭৫,৮০০ টাকা এবং ঢাকায় একজন প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারের প্রায় ৩,২৫,৬০০ টাকা, যা মাস্টার্স ডিগ্রিসহ প্রায় ৪,৪৫,১০০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে, বিশেষ করে Lean Six Sigma সনদপ্রাপ্ত বা প্ল্যান্ট ম্যানেজার পর্যায়ের পদে, বহুজাতিক কোম্পানিতে বেতন আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
আইপিই আর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর পার্থক্য কী?
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং একটা নির্দিষ্ট যন্ত্র বা প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করে, আইপিই পুরো উৎপাদন সিস্টেমকে একসাথে দেখে এবং তার দক্ষতা বাড়ানো নিয়ে কাজ করে।
আইপিই পড়তে কোথায় ভর্তি হওয়া যায়?
BUET, RUET, KUET, DUET (গাজীপুর) এবং BAUST (সৈয়দপুর) এ আইপিই পড়ার সুযোগ আছে।
আইপিই গ্র্যাজুয়েটদের বেতন কেমন?
ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের সাধারণ শুরু মাসে আনুমানিক ৳২০,০০০-৩০,০০০, অভিজ্ঞতা ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
আইপিই গ্র্যাজুয়েটরা কি BBA/MBA গ্র্যাজুয়েটদের সাথে একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন?
হ্যাঁ, বিশেষ করে প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট বা অপারেশনস পদে, এবং কারখানার কারিগরি দিকটা হাতে-কলমে বোঝার কারণে আইপিই গ্র্যাজুয়েটরা অনেক সময় এগিয়ে থাকেন।
আইপিই = Innovative, Proactive, Efficient! এই তিনটা গুণ একসাথে খুব কম সাবজেক্টেই পাওয়া যায়।
আরও দেখুন: এমএমই সাবজেক্ট রিভিউ, পিএমই সাবজেক্ট রিভিউ এবং Faculty of Engineering এর অন্য সাবজেক্ট রিভিউ।

