সাংবাদিকতা পড়া মানেই টিভিতে খবর পড়া, এই ধারণাটা এখন অনেকটাই পুরোনো। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার গ্র্যাজুয়েটরা আজ সংবাদমাধ্যমের বাইরে কনটেন্ট, বিজ্ঞাপন, কর্পোরেট যোগাযোগ আর ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের জগতেও কাজ করছেন। এই রিভিউতে Journalism-এর পড়াশোনা, ভর্তির পথ আর ক্যারিয়ারের বাস্তব ছবিটা খোলামেলা লিখলাম।
সূচিপত্র
Journalism-এ কী পড়ানো হয়
চার বছরের অনার্সে বিষয়টা দুই ভাগে চলে: তত্ত্ব আর হাতেকলমে কাজ।
- রিপোর্টিং ও সম্পাদনা: সংবাদ লেখা, তথ্য যাচাই, শিরোনাম করা, সম্পাদনার নিয়ম
- যোগাযোগ তত্ত্ব: গণমাধ্যম সমাজে কীভাবে কাজ করে, মতামত কীভাবে তৈরি হয়
- মিডিয়া আইন ও নৈতিকতা: কী প্রকাশ করা যায়, কী যায় না, সূত্র রক্ষার দায়
- ব্রডকাস্ট ও ফিল্ম: রেডিও-টিভির স্ক্রিপ্ট, ক্যামেরা, সম্পাদনার প্রাথমিক কাজ
- বিজ্ঞাপন ও জনসংযোগ (PR): ব্র্যান্ড যোগাযোগ, প্রচারণা পরিকল্পনা
- ডিজিটাল মিডিয়া: অনলাইন সাংবাদিকতা, সোশ্যাল মিডিয়া, ডেটা নিয়ে কাজ
এই বিষয়ে ভালো করার আসল শর্ত ক্লাসের বাইরে: ক্যাম্পাস পত্রিকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি বা কোনো পোর্টালে লেখালেখি শুরু করা। প্রথম বর্ষ থেকেই যাঁরা লিখতে শুরু করেন, পাস করার সময় তাঁদের হাতে একটা পোর্টফোলিও থাকে, আর নিয়োগে সেটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা।
কেমন মানুষের জন্য
কৌতূহল আর লেখার অভ্যাস, এই দুটোই মূল শর্ত। যাঁরা প্রশ্ন করতে ভালোবাসেন, অচেনা মানুষের সাথে কথা বলতে সংকোচ করেন না, আর দ্রুত সময়সীমার চাপে কাজ করতে পারেন, তাঁদের জন্য বিষয়টা উপভোগ্য। উল্টো দিকটাও সৎভাবে বলা দরকার: শুরুর দিকে বেতন তুলনামূলক কম, কাজের সময় অনিয়মিত, আর সংবাদমাধ্যমের চাকরির বাজার স্থিতিশীল না। যাঁরা নিশ্চিত-নিরাপদ চাকরি খুঁজছেন, তাঁদের এই বাস্তবতাটা জেনে নেওয়া ভালো।
কোথায় পড়বেন ও ভর্তি
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ দেশের সবচেয়ে পরিচিত, আর এটি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অন্তর্ভুক্ত। ভর্তি হয় কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিট দিয়ে; ২০২৫-২৬ সেশনে সেই ইউনিটে আসন ছিল ২,৯৩৪টি, পরীক্ষা ১০০ নম্বরের (৬০ MCQ + ৪০ লিখিত, পাস নম্বর ৪০)। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও অনেক পাবলিকেও বিভাগটি আছে; এর কয়েকটিতে ভর্তি হয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে। বিভাগের কোর্স-কাঠামো দেখতে পারেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল সাইটে।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়: Media Studies and Journalism নামে বেশ কিছু প্রাইভেটে প্রোগ্রাম আছে, যেখানে স্টুডিও-সুবিধা আর ইন্ডাস্ট্রির সাথে যোগাযোগ তুলনামূলক ভালো। খরচের হিসাব মেলাতে দেখুন আমাদের NSU আর BRAC রিভিউ।

ক্যারিয়ারের পথ
- সংবাদমাধ্যম: পত্রিকা, টেলিভিশন আর অনলাইন পোর্টালে রিপোর্টার, সাব-এডিটর, নিউজ প্রেজেন্টার
- কর্পোরেট যোগাযোগ ও PR: ব্যাংক, টেলিকম, বড় গ্রুপের কমিউনিকেশন বিভাগ; আয় আর কাজের সময় দুটোই সংবাদমাধ্যমের চেয়ে স্থিতিশীল
- কনটেন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিং: কনটেন্ট রাইটিং, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবস্থাপনা, স্ক্রিপ্ট, এই ক্ষেত্রটাই এখন সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে
- উন্নয়ন সংস্থা ও NGO: কমিউনিকেশন অফিসার, ডকুমেন্টেশন, প্রচারণা
- সরকারি চাকরি: BCS (তথ্য) ক্যাডারসহ যেকোনো সাধারণ ক্যাডার, তথ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ বেতার-টেলিভিশন
- শিক্ষকতা ও গবেষণা: মাস্টার্সের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে
বিদেশে মিডিয়া বা কমিউনিকেশনে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা থাকলে শুরু করুন বিদেশে উচ্চশিক্ষার গাইড আর IELTS গাইড দিয়ে।
কোথায় পড়লে কী সুবিধা
Journalism পড়ার জায়গা বাছাই করার সময় শুধু নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না, সুবিধাগুলো আলাদা আলাদা।
- পুরোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়: সবচেয়ে বড় সুবিধা নেটওয়ার্ক। এখানকার সাবেক শিক্ষার্থীরা প্রায় সব বড় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে আছেন, আর ইন্টার্নশিপ বা প্রথম চাকরির খোঁজ অনেক সময় সেই সূত্রেই আসে। খরচও কম।
- নতুন পাবলিক ও গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিযোগিতা তুলনামূলক কম, ফলে ভর্তির সুযোগ বেশি। তবে স্টুডিও বা সম্পাদনার যন্ত্রপাতি সব জায়গায় সমান থাকে না, ভর্তির আগে বিভাগের সুবিধাগুলো জেনে নেওয়া ভালো।
- প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়: ক্যামেরা, স্টুডিও আর সফটওয়্যারের সুবিধা সাধারণত ভালো, আর ইন্ডাস্ট্রির সাথে যোগাযোগও ঘনিষ্ঠ। খরচ অনেক বেশি, তাই ওয়েভার পাওয়ার সুযোগটা আগে যাচাই করে নিন।
একটা কথা মনে রাখবেন: এই বিষয়ে নিয়োগের সময় নিয়োগকর্তারা সার্টিফিকেটের চেয়ে আপনার কাজ দেখতে চান। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপনি চার বছরে কী কী লিখেছেন বা বানিয়েছেন।
পড়ার সময় যা করলে ক্যারিয়ার এগোয়
Journalism এমন একটা বিষয় যেখানে পাস করার আগেই কাজ শুরু করা যায়, আর যাঁরা করেন তাঁরা অন্যদের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকেন। প্রথম বর্ষ থেকেই এই কাজগুলো ধরে রাখুন:
- ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা: বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্র বা সাংবাদিক সমিতিতে যুক্ত হন। ছোট ছোট রিপোর্ট লিখতে লিখতেই লেখার হাত তৈরি হয়।
- নিয়মিত প্রকাশ: মাসে অন্তত দুটো লেখা কোথাও প্রকাশ করার লক্ষ্য রাখুন, সেটা অনলাইন পোর্টাল হোক বা নিজের ব্লগ। চার বছর পর এটাই আপনার পোর্টফোলিও।
- একটা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হন: সব বিষয়ে লেখার চেয়ে একটা ক্ষেত্র বেছে নিন, যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি বা অর্থনীতি। বিশেষায়িত রিপোর্টারদের চাহিদা সবসময় বেশি।
- প্রযুক্তির দক্ষতা: ছবি সম্পাদনা, ভিডিও কাটা, বা ডেটা নিয়ে সাধারণ কাজ শিখে রাখুন। এখনকার নিউজরুমে এই দক্ষতাগুলো আলাদা মূল্য পায়।
- ইন্টার্নশিপ: তৃতীয় বর্ষ থেকেই চেষ্টা শুরু করুন। বেতন না পেলেও অভিজ্ঞতা আর যোগাযোগ দুটোই তৈরি হয়।
ইংরেজিতে দখল থাকলে সুযোগ আরও বাড়ে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংস্থা আর ইংরেজি দৈনিকে। প্রস্তুতির জন্য আমাদের IELTS গাইডটা দেখতে পারেন।
সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
বিজ্ঞান বা ব্যবসায় শাখা থেকে কি সাংবাদিকতা পড়া যায়?
যায়। ঢাবির কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটে সব শাখার শিক্ষার্থীই পরীক্ষা দিতে পারেন, আর বিজ্ঞান-অর্থনীতির পটভূমি থাকলে বিশেষায়িত রিপোর্টিংয়ে সেটা বাড়তি সুবিধা দেয়।
ইংরেজিতে দুর্বল হলে সমস্যা হবে?
বাংলা মাধ্যমেও ভালো ক্যারিয়ার হয়, তবে ইংরেজি জানা থাকলে আন্তর্জাতিক সংস্থা আর ইংরেজি দৈনিকের দরজা খোলে। প্রথম বর্ষ থেকেই চর্চা শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ।
সাংবাদিকতায় বেতন কেমন?
প্রতিষ্ঠানভেদে পার্থক্য অনেক বড়। শুরুতে সংবাদমাধ্যমে আয় সাধারণত কম থাকে; কর্পোরেট যোগাযোগ বা ডিজিটাল কনটেন্টে শুরুটা তুলনামূলক ভালো হয়।
পড়ার সময় কি কাজ শুরু করা যায়?
শুধু যায় না, করা উচিত। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা, ফ্রিল্যান্স লেখা বা ইন্টার্নশিপ, যেকোনো একটা দিয়ে শুরু করলে পাস করার আগেই পোর্টফোলিও তৈরি হয়ে যায়।
এই বিষয়ে সেশনজট কেমন?
বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে আলাদা। প্রাইভেটে সেমিস্টার পদ্ধতির কারণে জট কম, পাবলিকে বিভাগভেদে কমবেশি হয়।

